slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

ফুলবাড়ি- লাল সেলাম!



দিনাজপুর প্রতিনিধি খবর দেওয়ার আগেই ফুলবাড়ি গণবিদ্রোহে গুলি চালানোর প্রথম খবর পাওয়া হয় আন্দোলনের বন্ধুদের কাছ থেকে। তারাই ঘটনাস্থল থেকে জানান, তখনো গুলি আর টিয়ার শেল বর্ষণ চলছে। খবরটি নিশ্চিত করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে দিনাজপুরে পরিচিত সাংবাদিকদের টেলিফোন করা হয়।


তখন কর্মস্থল ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র। অফিসে জানানো হয়, টপমোস্ট নিউজ তৈরি হচ্ছে; ব্রেকিং তো বটেই। দিনাজপুরের সাংবাদিকরা তখন গুলিবর্ষণের খবরে মটর সাইকেলে ঘটনাস্থল ফুলবাড়িতে রওনা হয়েছেন। পরিস্থিতির এতোটা অবনতি হবে তারা ভাবতেই পারেননি। তাই সেদিন সবাই দিনাজপুর সদরেই অবস্থান করছিলেন, তাদের ভরসা ছিল ফুলবাড়ির থানা সংবাদদাতার ওপর।


টেলিফোনে নিউজ সংগ্রহ করে প্রথম ব্রেকিং নিউজ দেওয়া হয় সন্ধ্যার কিছু আগে। এরপর আরো টেলিফোন, একের পর নিউজ আপডেট চলতে থাকে। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭ টা থেকে চলে টিভি মনিটরিং। একেক টেলিভিশন তখন সহিংসতার একেক রকম খবর দিচ্ছিল। হতাহতের সংখ্যা নিয়েও টিভি সংবাদের রকমফের লক্ষ্য করা যায় সহজেই।


অফিস বসদের জানানো হয়, ওই রাতেই ফুলবাড়ি যাওয়া দরকার। অফিস অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে রাতেই চেপে বসা হয় দিনাজপুরের বাসে। বাসের হেলপারকে বলে রাখা হয়, ফুলবাড়ির আন্দোলন দেখলে যেন ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়; সাংবাদিক সেখানেই নেমে যাবে। ভোর রাতে হেলপার ঘুম ডেকে তোলেন, সাংবাদিক ভাই, আন্দোলন দেখেন!


কাঁচা ঘুম ভেঙে আবছা আলোর ভেতর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখা যায়, বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় ব্যরিকেড দেওয়া হয়েছে। তবে ফুলবাড়ি--দিনাজপুর মহাসড়কটি তখন শুনশান। কোথাও কোনো পিকেটার নেই। হেলপারসহ কয়েকজন  যাত্রী অনেক কষ্টে কয়েকটি ব্যারিকেড সরিয়ে দিনাজপুর যাওয়ার জন্য বাসের পথ পরিস্কার করেন।


রণাঙ্গনের ভেতর

ওই সকালেই ফুলবাড়ি থানার ওসি, ইউএনও এবং দিনাজপুর এসপির বক্তব্য টেলিফোনে নেওয়া হয়ে যায়। দিনাজপুর প্রতিনিধি ওই সকালেই বাসস্ট্যান্ড থেকে সাংবাদিককে পিকআপ করেন। হোটেল রুমে লাগেজ-ব্যাগেজ রেখে ফ্রেশ হওয়া, স্নানাহার, বিশ্রাম-- ইত্যাদি নৈমিত্তিক বিষয়-আশায় বাদ দিয়েই সরাসরি পৌঁছানো যায় একটি কম্পিউটার ল্যাবে।


তখনও দোকান-পাট ভাল করে খোলেনি। কম্পিউটার ল্যাবের ম্যানেজারকে টেলিফোন করে বাসা থেকে ডেকে দোকান খোলানো যায়। জানা গেল, দিনাজপুরের প্রধান সমস্যা বিদ্যুৎ বিভ্রাট। তবে এই ল্যাবে আইপিএস থাকায় লোডশেডিং-এর ভেতরেও ঘন্টাখানেক কম্পিউটার-ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব। আগাম টাকা দিয়ে একটি কম্পিউটার সার্বক্ষনিক ব্যবহারের জন্য বুকিং দিয়ে ল্যাবের এক পাশে ব্যাগেজ রেখে তখনই কম্পিউটারে বসে পড়া হয় ফুলবাড়ির টাটকা খবর টাইপ করতে।


একটি দেড়শ শব্দের স্পট নিউজ অফিসে ইমেইল করে খুঁজে বের করা হয় রেন্টে কারের দোকান। ফুলবাড়ি যেতে কেউই রাজি নন। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে অভয় দিলে একজন অবশেষে রাজি হন মোটা টাকায় ফুলবাড়ি যেতে। ঠিক হয়, যেখানে ব্যারিকেডের কারণে গাড়ি আর যেতে পারবে না, ড্রাইভার সেখানেই সাংবাদিককে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবেন। রেন্টে কারের অফিসের টয়লেটে ফ্রেশ হয়ে ভাড়া করা ছোট্ট ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে তখনই ফুলবাড়ি বেরিয়ে পড়া হয় একা।


প্রতিনিধিকে বলা হয়, দিনাজপুরেই অবস্থান করতে। তিনি প্রশাসনিক খবরা-খবর মোবাইল ফোনে সরবরাহ করতে যেনো প্রস্তুত থাকেন, এরকম ছোটখাট কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফুলবাড়িতেই রাত্রি যাপন করতে হতে পারে ভেবে হ্যাভারশেকটিকে সঙ্গেই থাকে। তখনো প্রাতরাশ সারা হয়নি। ... 


ট্যাক্সি ক্যাবের সামনে-পেছনে বড় বড় হরফে 'সংবাদপত্র' কথাটি লিখে টেপ দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল আগেই। পুরনো একটি লাল সালুর ব্যানার ছিঁড়ে গাড়ির একপাশে ঝোলানো হয় একটি ছোট লাল পতাকা-- ইমার্জেন্সি সাইন। গাড়ি এগিয়ে চলে, গাড়িতে বসেই দোকান থেকে কেনা কলা-বিস্কুট দিয়ে সারা হয় সকালের প্রথম আহার। পথের দু-দিকের চায়ের ঝুপড়ি দোকান-পাট বন্ধ বলে চা পর্বটি বাদ থেকে যায়।


পুরো দিনাজপুর-ফুলবাড়ি সড়ক একেবারে ফাঁকা। কোথাও কোনো জনমানুষ নেই। মাঝে একবার বিডিআর (এখন বর্ডার গার্ড) সদস্যরা হাত তুলে গাড়ি থামান। পরিচয় - গন্তব্য জেনে আবার যাত্রা শুরু। আবারো সামনে কি এক অজানা বাধা পেয়ে হঠাৎ ব্রেক কষে ড্রাইভার। ক্যাব থেকেই পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা হয়।


একটু দূরে পথের মধ্যে আগুন জ্বেলে, কাটা গাছ ফেলে ব্যারিকেড দিয়েছে আন্দোলনের মানুষ। আট-দশ জন যুবক মোটা মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে ক্যাবের দিকে তেড়ে আসে। লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে চিৎকার করে পরিচয় জানানো হয়; গলায় ঝোলানো আইডি কার্ড উঁচিয়ে অনুরোধ করা হয়, যেনো গাড়িটির কোনো ক্ষতি না হয়। পিকেটাররা সকলেই স্থানীয় কলেজ ছাত্র। সব কিছু শুনে তারা প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বলেন, ঠিক আছে ভাই, আপনি নির্ভিয়ে সামনে যান। শুধু আমাদের পক্ষে লিখবেন। কলম যেনো আবার এশিয়া এনার্জির দিকে না যায়!...

ডেটলাইন ফুলবাড়ি


এদিকে গাড়ি ভাঙচুরের ভয়ে ড্রাইভার বেঁকে বসেছেন। কিছুতেই তিনি ফুলবাড়ি আর যাবেন না। এবার ওই পিকেটাররাই তাকে শাসায়, সাংবাদিককে ফুলবাড়ি নিয়ে না গেলে এখানেই গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে--ইত্যাদি।


এই হুমকিতে কাজ হয়। বুদ্ধি করে পিকেটারদের একজনের সঙ্গে খাতির জমিয়ে গাড়ির সামনের আসনে তুলে নেওয়া হয়। সেও কলেজ ছাত্র, এইচএসসিতে প্রথম বর্ষে পড়ে। নাম জানায়, তাজ। পরে তার সঙ্গে চমৎকার বন্ধুত্ব হয়। এর পরের আন্দোলনমুখর  দিনগুলোতে তাজ মোবাইল ফোনে মিসড কল দিলেই ওকে কল ব্যাক করে জেনে হয়েছে আন্দোলনের নানা টাটকা খবর।


ফুলবাড়িতে তাজই সাংবাদিকের গাইড হিসেবে কাজ করে। পিকেটাররা গাছের গুড়ির ব্যারিকেড সরিয়ে পথ করে দেয়। যাত্রা পথের বাকী পথটুকু তাজ-ই নিরাপত্তা পাস হিসেবে কাজ লাগে। পথে আরো দু/একটি এরকম বাধা-বিপত্তি ঠেলে গাড়ি এগিয়ে চলে।


ফুলবাড়ির একটু আগেই গাড়ি থেকে নেমে পড়তে হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে পিকেটাররা লোহার একটি ব্রিজের কয়েকটি পাটাতন খুলে ফেলায় সামনের পথ বন্ধ। ব্রিজের পাশেই এক জায়গায় শুকনো রক্তের দাগ। ইটের টুকরো দিয়ে সেই স্থানটি ঘিরে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাজ জানায়, আগের দিনই সেখানে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন ফুলবাড়ির তিনজন শহীদের একজন কলেজ ছাত্র তরিকুল!


পাশেই জটলা করছেন কয়েকজন আন্দোলনকারী গ্রামের সাধারণ মানুষ। ব্রিজের ওপারের রাজপথে বিশাল মিছিল হচ্ছে। লাঠিশোটা হাতে হাজার হাজার মানুষ। মিছিলের সামনে গ্রামের বউ-ঝি'রা। অনেকের হাতে ঝাড়ু, কারো হাতে জুতা-সেন্ডেল। মিছিল থেকে রণহুংকার ভেসে আসে:


এশিয়া এনার্জির দালালরা,
হুঁশিয়ার, সাবধান!

ক্ষেপেছে রে ক্ষেপেছে,
ফুলবাড়ি ক্ষেপেছে!

জেগেছে রে জেগেছে,
ফুলবাড়ি জেগেছে!

ফুলবাড়ি স্মরণে,
ভয় করি না মরণে!

ক্যাবটিকে দ্রুত একটি নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে মিছিলকারীদের নেতৃত্বদানকারী ফুলবাড়ি আন্দোলনের স্থানীয় কয়েকজন নেতার ভাষ্য নেওয়া হয়। আরো কয়েক ঘন্টা আন্দোলনকারীদের মিছিল-বিক্ষোভ, ফুলবাড়ির মোড়ে মোড়ে টায়ার পোড়ানো দেখা হয়। তীব্র তাপদহ, মানুষের সুশৃঙ্খল স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ, নাইট-জার্নি জনিত ক্লান্তি -- সবকিছু সাংবাদিকের নার্ভ ভোঁতা করে দেয়। নিজেকে একটি যন্ত্রমানুষ বলে ভ্রম হয়, দি নিউজ ম্যান!


এদিকে মাথায় কাজ করে, সন্ধ্যার আগেই দিনাজপুর পৌঁছতে হবে। অনির্দিষ্ট হরতালের কারণে ফুলবাড়ির সমস্ত দোকান-পাট সব বন্ধ। এছাড়া আন্দোলনকারীদের জ্বালাও-পোড়ানোর আগুন থেকে দুর্ঘটনা হতে পারে, এই ভয়ে সেখানের বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাই ইমেইলে ঢাকা অফিসে ফুলবাড়ি সংবাদ পাঠানোর জন্য দিনাজপুর ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।


তখনও শিশুতোষ অনলাইনপত্রটির অফিস থেকে রিপোর্টারদের ল্যাপটপ-মডেম সরবরাহ করা শুরু হয়নি। তবে অতি জরুরি সংবাদের কয়েকটি পর্ব দু-তিন ধাপে ঢাকা অফিসে টেলিফোনে দেওয়ার সুযোগ ছিল। তাই ফিরতি পথে ক্যাবে বসেই ঢাকা অফিসে টেলিফোনে ছোট্ট করে জানানো হয় ফুলবাড়ি রণাঙ্গনের টাটকা খবর।


ফেরার পথে ফুলবাড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আহত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে একজন গুলিবিদ্ধ সান্তালও রয়েছেন। জ্ঞানেশ কর্মকার নামের সেই সান্তাল যুবক যখন তীর - ধনুক নিয়ে শত শত সান্তাল নারী - পুরুষের মূল আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা বলছিলেন, তখন নার্স আর ওয়ার্ড বয়রা ভীড় জমান তার কথা শুনতে।


তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, গুলি যদি পায়ে না লেগে বুকে লাগতো?

সান্তাল বিদ্রোহী বলেন:


আমি তো একদিন মরবোই। গুলিতে আমি মারা গেলেও যদি এশিয়া এনার্জি এখান থেকে পালায়, তাইলে অন্তুত আমার ছেলেমাইয়া গুলান না খাইয়া মরবে না। এই জন্যই তো আমরা সংগ্রাম করতেছি। দ্যাশের জন্য জীবন দিব, রক্ত দিব, কয়লা দিব না!


সান্তাল যুবকের এই সাহসী বক্তব্যকে নার্স-ওয়ার্ড বয়রা ‌পিঠ চাপড়ে 'শাবাশ, শাবাশ' বলে বাহবা দেন।


এরপর দিনাজপুরে পৌঁছে দ্রুত বিস্তারিত নিউজ লিখতে বসে যাওয়া হয়। ছোট্ট মফস্বল শহরটিতে তখন সন্ধ্যা ঘনাতে শুরু করেছে। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা থেকে ডাউনলোড করা হয় বাছাই করা আন্দোলনের কিছু খবর। ফুলবাড়ি বিদ্রোহের ডিটেইল স্পট নিউজ, সাইড স্টোরি, বিক্ষুব্ধ মানুষে ছবি -- ইত্যাদি ঢাকা অফিসে ইমেইল করে একটি হোটেল খুঁজে স্নানাহার সেরে নেওয়া গেল। ব্যাস্ততার কারণে সেদিন দুপুরে ভাত খাওয়া হয়নি। টানা প্রায় ২০ ঘন্টার ধকলে সমস্ত শরীর যেনো ভেঙে আসতে চায়।...


এর পরপরেই আন্দোলনের যোদ্ধা, ফুলবাড়িতে সাহায্যকারী বন্ধুবরেষু কলেজ ছাত্র তাজের দু-তিনটি মিসড কল ভেসে আসে মোবাইল ফোনে। কল ব্যাক করতেই অপরপ্রান্তে তার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর,


বিপ্লব দা, আমরা এশিয়া এনার্জির ল্যাবরেটরীতে আগুন দিয়েছি! দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে! পুলিশ - বিডিআর সবাই পালিয়েছে!


তখনই ওসি - এসপির সঙ্গে কথা বলে খবরটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তারা জানান, রাস্তা বন্ধ থাকায় দমকল বাহিনীর গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারছে না। পুরো ল্যাবরেটরী এরই মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।


আবারো অফিসে টেলিফোনে জানানো হয়-- সেদিনের সর্বশেষ আপডেট নিউজ। সাজেস্ট করা হয়, সেদিনের নিউজের শিরোনামে যেনো 'অগ্নিগর্ভ ফুলবাড়ি' কথাটি থাকে। অফিস এই কথাটি সেদিন রেখেছিল।

বিদ্রোহ আজ, বিদ্রোহ চারিদিকে


এর পর আবারো সেই ট্যাক্সি ক্যাবে খানিকটা পথ এগিয়ে বাকিটা পথ হেঁটে হেঁটে প্রচন্ড তাপদাহের ভেতর আন্দোলনের আপডেট নিউজ করা।


শহীদ তরিকুলের বাসায় পৌঁছে ওর মা’র ভাষ্য নিয়ে সাইট স্টোরি করা। আহতদের নিয়ে তৈরি করা হয় আরেকটি হিউম্যান স্টোরি।


সে সময় খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সুযোগ ঘটে, ফুলবাড়ির গণবিদ্রোহের সংগঠিত আগুন। এশিয়া এনার্জির কর্মকর্তাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আন্দোলনকারীরা আগুন দেয়। এ সব বাড়ির মালিকরা জীবন বাঁচাতে আগেই স্বপরিবারে পালিয়ে বেঁচেছে। ফুলবাড়ি থানার সামনেই লুঙ্গি পরা আম জনতা রাস্তার ওপরে এসব বাড়ি থেকে ফ্রিজ, টেলিভিশন আর দামি দামি আসবাব আছড়ে ভাঙে, আগুন দেয়। কোথাও কোনো লুঠপাট হয়নি।


এক সময় থানার ভেতর থেকে হ্যান্ড মাইকে ওসির অসহায় আর ভীত - সন্ত্রস্ত গলা ভেসে আসে:


ভাইসব, ভাইসব, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যান। আমরা আপনাদের পক্ষে আছি। শুধু থানার কোনো ক্ষতি করবেন না। পুলিশ-জনতা ভাই, ভাই! ...


গণআন্দোলনের ওই উত্তাল মূহুর্তেও সাধারণ মানুষের হাস্যরস সাংবাদিককে সংগ্রামী মানুষ সর্ম্পকে ভাবায়।


রাস্তার ওপর কাঠ-খড়কুটোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন কয়েকজন। কালো ধোঁয়া তৈরি করতে সবুজ পাতাসহ গাছের ডাল ভেঙে দেওয়া হয় আগুনে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন জোড়া মুরগি হাতে একজন বয়স্ক মানুষ। তিনিও হাতের মুরগি দুটি এক পাশে নামিয়ে রেখে কয়েকটি কাঁচা পাতা ছিঁড়ে আগুনে ফেলে দেন। পিকেটার যুবকরা মশকরা করে তাকে স্থানীয় ভাষায় বলেন,  ও চাচা মিয়া, পাতা না দিয়া আগুনে মুরগি দিলে ধোঁয়া তো আরো ভাল হইতো! চাচা বলেন, হ, আর তোমরাও গরমা গরম রোস্ট খাইতে পারতা! কিন্তু তোমার চাচি যে আমারে আর ঘরে ঢুকতে দিবো না!...


এর পর সমস্বরে সকলের অট্টহাস্য।


আন্দোলন মুখর ফুলবাড়ির ঘটনাবলির পরের পর্ব মোটামুটি সবারই জানা। রাজশাহীর মেয়র মিনু সে সময় ফুলবাড়িতে এসে বেশ রাতে একটি নাটুকে চুক্তি করেন আন্দালনকারীদের সাথে। ওই চুক্তিটি সে সময় আদৌ সরকার পক্ষের সঙ্গে সাক্ষরিত হয়েছিলো কী না, এ প্রশ্ন তখনই উঠেছিল।


এই বিতর্কের বাইরে ফুলবাড়িতে কয়লা খনি খনন প্রকল্পের কাজ গুটিয়ে নিলেও চুক্তি মেনে এশিয়া এনার্জিকে এখনো এ দেশ থেকে বহিস্কার করা হয়নি। শুনতে পাওয়া যায়, আবারো তারা ফুলবাড়িতে খনন কাজ শুরু করার পায়তাড়া কষছে!..
---
ছবি: ফুলবাড়ি বিদ্রোহ-১, ফুলবাড়ি বিদ্রোহ-২, হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ আদিবাসী বিদ্রোহী, আগস্ট ২০০৬, লেখক।


---
ফাইল স্টোরি-১: Authorities accept 6-point demand of Phulbari
ফাইল স্টোরি-২: A wounded tribal protester ready to die for the country

12345
Total votes: 208

মন্তব্য

 ফুলবাড়ির বিপ্লবী মানুষদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। লেখককে ধন্যবাদ।

বিপ্লব রহমান-র ছবি

পাঠ ও মন্তব্যর জন্য অনেক ধন্যবাদ।

উন্মোচনের প্রতিষ্ঠাবাষির্কীতে আপনার দূরালাপনে অনেক কৃতজ্ঞতা। শুভেচ্ছা রইল।

এশিয়া এনার্জিরে মাইরা ভাইঙ্গা ফালান নাগব।

পুনশ্চ: লেখা দারুণ হইছে। স্পষ্ট দেখা যায় সব।

বিপ্লব রহমান-র ছবি

এশিয়া এনার্জিরে মাইরা ভাইঙ্গা ফালান নাগব।

এ ক ম ত। চলুক।

ফুলবাড়ি নিয়ে অনেকগুলো লেখা পড়েছি, কিন্তু এই লেখাটা আলাদা, একদম  ভিন্ন এ্কটা প্রেক্ষিত থেকে আন্দোলনটাকে জানা গেল।

"সাজেস্ট করা হয়, সেদিনের নিউজের শিরোনামে যেনো 'অগ্নিগর্ভ ফুলবাড়ী' কথাটি থাকে। "

ধন্যবাদ বিপ্লবদা। ফুলবাড়ীর মত গোটা দেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠুক। গণসংহতিগ্রুপে শেয়ার দিলাম লেখাটা।

বিপ্লব রহমান-র ছবি

তাই? অনেক ধন্যবাদ ফিরোজ।

কাল উন্মোচনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আপনার ব্লগ ভাবনাটুকু জেনেও ভালো লেগেছে। আশাকরি এখানে আপনার ব্লগ লেখালেখি অব্যহত থাকবে। শুভ কামনা রইলো।

আজাদ-র ছবি

বিপ্লব ভাই, ওই দিন ২৬ আগষ্ট আমি ছিলাম ফুলবাড়ি বাজারের আশপাশের গ্রামগুলোতে। ফুলবাড়ির বিষয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া, সমাবেশে যাওয়ার জন্য নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়োদের প্রস্তুতি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ওই একটা আন্দোলন ব্যাপক গণমানুষকে গভীরভাবে ধারণ করতে পেরেছিল বলে মনে হয়। পরেও ফুলবাড়িতে দু'একবার গেছি, দেখেছি আন্দোলনের সাগ্নিক জ্বলতেছে ধিকিধিকি। কিন্তু আমরা ফুলবাড়িকে ছড়িয়ে দিতে পারিনি, পারছি না। কেন পারিনি কেন পারছি না? প্রতিদিন লুট হচ্ছে এদেশের গণমানুষ, যতটা লুট হচ্ছে তার চাইতে অনেক বেশী অপচয় হচ্ছে গণমানুষের জীবন-সম্পদ, এই লুটেরা শাসকগোষ্ঠির হাতে।

লেখাটার জন্য স্যালুট।

বিপ্লব রহমান-র ছবি

ফুলবাড়ির গণবিদ্রোহ কেনো ছড়িয়ে দিতে পারা যাচ্ছে না, সেটির সঠিক ব্যাখ্যা দেবেন রাজনৈতিক তাত্ত্বিকেরা। তবে আমার মনে হয়, একটি আন্দোলনের বিস্তৃতির উৎস হচ্ছে-- সাংগঠনিক দৃঢ়তা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বিপ্লবী তাগিদের কেন্দ্রে। গাছের ফলটি পেকে উঠলে আপনিই তা খসে বৈকি।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

বিপ্লব রহমান-র ছবি

* সংশোধনী: গাছের ফলটি পেকে উঠলে আপনিই তা খসে পড়বে বৈকি।



 

 ওই বিপ্লবীদের শ্রদ্ধা..লেখা ভালো লাগলো।

বিপ্লব রহমান-র ছবি
বিপ্লব রহমান-র ছবি

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আগামীতেও সঙ্গে থাকার বিনীত অনুরোধ।

বিপ্লব রহমান-র ছবি

জ্ঞানেশ কর্মকার সাওতালদের নাম হয় না। কোন সাওতালের টাইটেল ‌কর্মকার' নেই।

ঠিক; কিন্তু সান্তাল বিদ্রোহী সেদিন এভাবেই তার পেশাগত পরিচয় দিয়েছিলেন। অনুগ্রহ করে সেদিনের এই রিপোর্টটি দেখুন।

কয়লা খনি নিয়ে আপনার বাদবাকী চিন্তাশীল মতামতের জন্য সাধুবাদ জানাই। খুব ভালো হয়, আপনি যদি এ বিষয়ে উন্মোচনে কোনো নতুন লেখা দিন।

অনেক ধন্যবাদ।

জুয়েল বিন জহির-র ছবি

বিপ্লব'দাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই পোস্টটির জন্য...

 

 

...........................................................................................................

ফই সা...ফই গ্নি...ফই গিত্তাম...

বিপ্লব রহমান-র ছবি

পাঠ ও মন্তব্যর জন্য আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।


কাল উন্মোচনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে এলে দেখা হতে পারতো। সেই কবে এমএন লারমার স্মরণসভায় দেখা...

জুয়েল বিন জহির-র ছবি

আসার খুব ইচ্ছা ছিল...জ্যামের কারণে চট্টগ্রাম থেকে সকাল ৮টায় রওনা দিয়ে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছাই সন্ধ্যা ছয়টায়...তাই মিস করেছি খুব...আফসোস!

 

 

...........................................................................................................

ফই সা...ফই গ্নি...ফই গিত্তাম...

বিপ্লব রহমান-র ছবি
শশাঙ্ক বরণ রায়-র ছবি

ফুলবাড়ির তাজা আগুন দেখা যায় এই লেখায়, ছবিতে। দুর্দান্ত, বিপ্লব দা।

........................................................

আদিবাসী বাঙ্গালী যত প্রান্তজন
এসো মিলি, গড়ে তুলি সেতুবন্ধন

বিপ্লব রহমান-র ছবি

সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে আবারো ধন্যবাদ।

মন্তব্য