slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

এ কেমন তাবিজ ব্যাথাও কমে না বিষও নামে না

কবি হেলাল হাফিজ। প্রতিদিন প্রেসক্লাব কেন্টিনের একটি কোনায় বসে দুপুরের ভাত খান। আজ তিনি অন্য একটি টেবিলে বসে ভাত খাচ্ছিলেন। পাশের চেয়ারটায় বসে ভাতের অর্ডার দিলাম। ইচ্ছা খেতে খেতে কবির সঙ্গে যদি কিছু কথা হয়। বললাম আমি নেত্রকোনার। আমার দিকে মুখ তুলে বললেন, কোথায়্। বললাম মোহনগঞ্জ। মুহুর্তেই অন্তরঙ্গ হয়ে গেলেন। বললেন আমার মেসো ময়েজউদ্দিন সাহেব এক সময় মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলে টিচার ছিলেন। বললাম, তিনি আমার শিক্ষক িছলেন। হেলাল হাফিজ বললেন, আমার বাবাও দত্ত হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। একবার পাইলট স্কুলের সঙ্গে দত্ত হাইস্কুলের ফুটবল নিয়ে মারামারি হলো। বাবা এই ঘটনার তদন্ত করতে মোহনগঞ্জ গিয়েছিলেন। আমিও বাবার সঙ্গে গিয়েছি। এটাই আমার মোহনগঞ্জ দেখা। ভাল লেগেছিল। তার পরেই অন্য কথা। কাব্য কবিতা। বললাম তাসলিমা নাসরিন আপনার সম্পর্কে ফেসবুকে লিখেছেন, তিনি আলোর মাঝে দাড়িয়ে ছিলেন একা। একটু হাসলেন, কবি। একটু পরে বললেন, নাসরিন আমাকে খুব সম্মান দিয়ে লিখেছে। বললাম নাসরিন তো তার কতে আপনাকে বলেছে আপনি তার প্রেমে পড়ে ছিলেন। যেমন আপনার কবিতা, ভালবেসে নাম রেখেছি তনা। প্রেম না দাও ছোবল দিও তুলে বিঁষের ফনা। কবি বললেন, প্রেম তো সব সময়েই করা যায়। আমিতো এখনো প্রেমে পড়ি। যাকে ভাললাগে তার সঙ্গেই তো প্রেম। কত জানা কত অজানার প্রেমে পড়েছি। এই এখন আপনার প্রেমেও পড়েছি। তনা কী তাসলিমা নাসরিন, কবি বললেন আমি জানি না। লোকে তাই বলে। (এখানে তাসলিমার নোটটা দিলাম। আমার বোন আজ কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে দেখা করেছে। ইনবক্সে দু'জনের কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছে। জানিনা আজ কত বছর পর হেলাল হাফিজকে দেখলাম। সম্ভবত তিরিশ বছর। খুব খারাপ একটা খবর দিলো বোন, হেলাল হাফিজের একটি চোখ নাকি পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে, ও চোখে নাকি তিনি একেবারেই এখন দেখতে পান না। ছানি কাটাতে গিয়েই নাকি ওই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আরেকটা চোখের জ্যোতিও নাকি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। তাহলে কি তিনি অন্ধ হয়ে যাবেন! একসময় হেলাল হাফিজের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল খুব। আমার নির্ভেজাল শুভাকাঙ্খী ছিলেন। খুব স্নেহ করতেন। খুব ভালোবাসতেন আমাকে। ময়মনসিংহ থেকে আমি ঢাকায় বেড়াতে এলে প্রায়ই প্রেসক্লাবে ডাকতেন, দুপুরে খাওয়াতেন, গল্প করতেন। উজাড় করে দিতেন, শুধু দিতেনই। কিছু নিতেন না। এত নির্লোভ আর নিঃস্বার্থ মানুষ আমি খুব কম দেখেছি জীবনে। যতটুকু তাঁকে আমার সমীহ করা উচিত ছিল, ততটুকু করিনি, যতটুকু ভালোবাসা উচিত ছিল, ততটুকু বাসিনি। ভুল মানুষদের সঙ্গে অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছি। তিনি আলোয় দাঁড়িয়ে ছিলেন একা। এতকাল তো আমাদের দেখা নেই, কথা নেই, কিচ্ছু নেই, তারপরও আমার বুকের ভেতর রিনরিন করে একটা কষ্ট বেজে চলেছে। কিছুতেই আমি মেনে নিতে পারছি না হেলাল হাফিজ অন্ধ হয়ে যাবেন। জানি আমাদের কখনও আর দেখা হবে না। তারপরও মনে হয় একদিন হয়তো কোথাও না কোথাও দেখা হবে। সেদিন সামনে দাঁড়ালে হেলাল হাফিজ আমাকে দেখবেন না, শুধু অন্ধকার দেখবেন, এ কী করে সইবো। এত আলোকিত মানুষের চোখে এত অন্ধকার মানায় না।)

কবি একটু অন্যমনস্ক হয়ে ভাত নাড়ছেন। হঠাৎ বললেন, আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন। বললাম এক ছেলে এক মেয়ে। আবার বললাম, তখন আপনি দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। আমি চিঠি দিয়ে একটি কবিতা পাঠিয়ে ছিলাম। আপনি ছাপিয়ে ছিলেন। তিনি আনমনে বললেন, প্রথম কবিতা কাগজে ছাপানোর আনন্দ প্রেমে পড়ার মতো। আমি বললাম, আপনার একটি কবিতা আমরা একটি লিটলম্যাগে ছাপিয়ে ছিলাম। কবিতাটি মনে নেই। কিন্তু একটি লাইন মনে আছে। এ কেমন তাবিজ করেছো তুমি ব্যাথাও কমে না বিষও নামে না। তিনি চমকে উঠলেন। বললেন, এটাইতো জীবনের সত্য। সত্যি হারিয়ে গিয়েছিল লাইনটা। একটা লাইনতো একটা কবিতা হয়ে উঠতে পারে। আমি এখনি এটি ফেসবুকে নিজ হাতে লিখে দিয়ে দিব। কী অসাধারণ লাইন। ওহ আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ভাত ভাতের থালায়। বললাম কবি খাচেছন নাতো। সম্বিত ফিরে পেলেন, বললেন, ওহ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। বৌমাসহ একদিন আসেন। আমার নিমন্ত্রণ। একসঙ্গে খাব। আমার তরফ থেকে তাকে নিমন্ত্রণ জানাবেন। বললাম আমরা একসঙ্গেই একদিন খাব। কবির খাওয়া শেষ। উঠে যাচ্ছেন কবি। বিরবির করে বললেন, এ কেমন তাবিজ করেছো তুমি ব্যাথাও কমেনা বিষও নামে না।

12345
Total votes: 204

মন্তব্য