slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

নিলুর নীল পাগড়ী (দ্বিতীয় অংশ)

(৪)
গ্রীষ্মের ছুটিতে আনোয়ারার কন্যা নাজমা আক্তার, জামাই বজলুল হুদা এবং একমাত্র নাতনি রানু পরদিন সকালে এসে উপস্থিত। এই দিনই আসবে এমন কোন কথা ছিল না, তবে জামাই চিঠি পাঠিয়েছিল এরকম কোন এক সময়েই আসবে। রানুর স্কুল ছুটি হয়েছে, জামাইয়ের কলেজও ছুটি, সে আবার দূরের এক উপজেলা সদরে কলেজের সহকারী অধ্যাপক। রানুরা প্রতিবছর অন্তত দুইবার এ বাড়িতে আসে, শীতে একবার, গ্রীষ্মে একবার। এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহ থেকে তারপর ফিরে যায়।
 
জন্মের পর চার বছরের মত এই গ্রামেই কাটে রানুর, তাই সারা বছর সে বাড়ি আসার জন্য মুখিয়ে থাকে। স্কুল ছুটি হবার সাথে সাথে সে মা-বাবার কান ঝালাপালা করতে থাকে, কবে বাড়ি যাব, বাবা ছুটি নেয় না কেন, ইত্যাদি। 
বাড়ি যাবার দিন ঠিক হলে সে নানান কিছু ভাবতে থাকে, কি কি করবে, কোথায় কোথায় যাবে। সকালে বাড়ি পৌঁছেই নাজু, রিনি, বকুলদের বাড়ি যাবে, পুতুল খেলা, রান্না রান্না খেলা, বাজার-সদায় খেলা, সুপারীর খোলের গাড়ী চড়া, সেই গাড়ীতে বাজার বোঝাই করে খেলার বাড়ী ফেরা আরও কত কী। এরপর তার স্কুলের গল্প করবে, নতুন বন্ধুদের গল্প করবে। বিকেল হলে মায়া খালার সঙ্গে এ বাড়ি সে বাড়ি বেড়াবে। রাতের খাওয়া শেষে গল্প শুনতে নানির পাশে শুয়ে পড়বে, শুরু হবে ঘ্যাঁঘাঁসুরের দেশ দিয়ে, আর চিরযৌবনের দেশ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়বে। আবার ভোরের আলো ফুটলেই দৌড়ে চলে যাবে রিনিদের জামতলায়, ওরাও অপেক্ষা করবে। আর কোন কারণে যদি বাড়ি যাবার দিন পিছিয়ে যায়, বাবার উপর খুব অভিমান হয়, শুধু কেঁদে বুক ভাসায়। এরপর সত্যি সত্যি যেদিন বাড়ি যাবার ক্ষণ উপস্থিত হয়, তখন রানু আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। কেন মুহূর্তের মধ্যে সে পৌঁছে যেতে পারে না বাড়ি? সারা পথ শুধু উত্তেজনায় ছটফট করতে থাকে। সেই উত্তেজনা কয়েকগুন বেড়ে যায় যখন দূর থেকেই বড় রেনট্রি গাছের মাথাটা দেখা যায়। এরপর ঠিক যখন বাড়ির কাছটায় পৌঁছায় তখন সে আনন্দে ফেটে পড়ে। হইচই করে দৌড়ে চলে যায় বাড়ির ভেতরে, নানু-নানির সাথে দেখা করে তাদের বুকের সাথে কিছুক্ষণ লেপ্টে থেকে এক দৌড়ে চলে যায় নাজু রিনি বকুলদের বাড়ি। রানুকে দেখামাত্র ওরাও যেন নতুন এক উৎসবের আনন্দ অনুভব করে, হৈ চৈ পড়ে যায়।
 
এবার হলো ব্যতিক্রম। বাড়িতে ঢুকেই রানুর উৎসাহ যেন ভীষণ ধাক্কা খেল। নানী শয্যায় পড়ে আছেন, চোখ ফোলা, গায়ে অনেক জ্বর, টলটল চোখে যেন রানুকে চিনতেও তার কষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থাতেই হাত তুলে রানুকে কাছে ডাকলেন, মাথায় আলগোছে হাত বুলিয়ে দিলেন, মাথাটা টেনে বুকের কাছে নিয়ে কিছু একটা পড়ে ফুঁ দিলেন। পাশেই বসে থাকল রানু। আনোয়ারা খাতুন যেন অজানার দিকে চেয়ে আছেন। নানির হাত রানু তার ছোট্ট হাতে নিয়ে বলল, “নানি তোমার কি খুব কষ্ট?” 
আনোয়ারা খাতুন অনেকটা ফিসফিসের মত অস্ফুটস্বরে বললেন, “নারে বু, এহন আর কষ্ট নাই”। এই বলে আলগোছে ছুঁয়ে দিলেন রানুর গাল।
অন্যপাশে নাজমা আক্তার বসে মায়ের মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে মুখে শাড়ির খুঁট ধরে বসে রইলেন, তার চোখ ভেঙে জল গড়িয়ে আসছে। নাজমার হাতটা নিজের হাতে নিলেন আনোয়ারা। হ্যাসহ্যাসে গলায় ভেঙে ভেঙে তিনি বললেন, “নিলু আইছে...কাইল সন্ধ্যায় ঝড়ের সোমায়...রাইতে আবার স্বপ্নে দ্যাহা দিয়া কইছে… আমারে লইয়া যাইবে...এইবার মনে হয় যাইতেই অইবে মা...তোগো জইন্য কিচ্ছু করতে পারলাম না...রানুর জইন্য...তোর জইন্য...জামাইর জইন্য...।” 
“মা, একটু থামবা?” নাজমা মায়ের হাত শক্ত করে ধরে, “তোমার কিচ্ছু হইবে না, তুমি কোনখানে যাবা না, তোমার খালি একটু জ্বর হইছে মা, অষুধ খাইলেই ঠিক হইয়া যাইবে।” 
“তোরা আমারে রাখতে পারবি না...আমার পোলা আইছে...তোগো লগে এই শ্যাষ...।” 
“কেউ আয় নাই মা, ঝড়ের মইধ্যে কত কি শব্দ, কি হোনছ না হোনছ, আল্লা আল্লা কর, সব ঠিক হইয়া যাইবে।” 
“তোরা বুজবি না...পোলার মর্যাদা তোরা কি বুজবি...পরিস্কার চান্দের আলোয় দেখছি...আমার পোলারে আমি চিনি না?...পষ্ট কইর‌্যা কইছে...মা তোমারে নেতে আইছি...। এইবার আমার মুক্তি...।” আনোয়ারা খাতুনের চোখে পানি জমেছে, নাকের গোড়ার দিকটা ভিজে লেপ্টে আছে। 
“চুপ করবা মা?” নাজমা আক্তার যেন ভেঙে পড়লেন, “একটু চুপ করো”! আনোয়ারা খাতুন আর কথা বললেন না। নাজমা আক্তার বসে থাকলেন, মায়ের হাত ছাড়িয়ে তার বুকের ওপর রাখলেন। রানুর চোখ ভেঙে না পড়লেও বুকে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করলেন নানা। রানুকে তার নানীর শয্যা থেকে নামিয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলেন। ঘরের মাঝখানের এই কক্ষটি আধো অন্ধকার, শুধুমাত্র পশ্চিম পাশে একটি জানালা, বাইরে ঝকঝকে চড়া রোদ উঠেছে, ছোট জানালা দিয়ে আলো ঢুকলেও তা অপ্রতুল, ঘরের ভেতরটা যেন আলো-অন্ধকারে মাখামাখি হয়ে থাকে।
 
সূর্য মাথার ওপর ওঠার আগেই লাবু, বুলু আর বজলুল হুদা করমদ্দি ওঝা ও তার স্যাঙাত হারুকে নিয়ে এই বাড়িতে ঢুকলেন। নানা বয়সের বাচ্চা-কাচ্চাদের একটা ছোট স্রোত ব্যাপক উৎসাহে পিছু নিয়েছে। বাড়ির সীমানায় ঢুকে করমদ্দি পেছন ফিরে চোখ লাল করে বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “এই সীমানার মধ্যে একটাও ঢোকবা না, জ্বেনের নজইরদ্যা হেইলে কেউ রেহাই পাবা না কইলাম।” বাচ্চাদের স্রোত হঠাৎ থেমে গেল। বড়দের দল বাড়ির ভেতরে চলে গেলে অতি সাহসী দু-একজন বাড়ির সীমানায় পা রাখলেও ভেতরে ঢোকার আর সাহস করেনি।
 
উঠানের মাঝখানে করমদ্দি দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখ সরু করে বাড়ির চতুষ্কোন নীরিক্ষা করে উপরে হাত তুলে চড়া স্বরে বলে উঠল, “আল্লা, তুমি রক্ষা করনেওআলা।” প্রথমে বজলুল হুদার দিকে তারপর অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বেদহল অইয়া গ্যাছে।” একটু থেমে আবার বলল, “আল্লার কালামের দহল লওয়া লাগবে, বাড়ির চাইরপাশে বল্লার চাকের মত বাসা বাইন্ধা রাখছে, চাক ভাইঙ্গা দেতে অইবে।”
 
উঠানে পাটি বিছিয়ে দেয়া হল। আল্লার কালাম পড়া বালুর থলে নিয়ে করমদ্দি ও বজলুল হুদা ঘরে প্রবেশ করল। হারু এদিকে লাবু আর বুলুকে নিয়ে বাড়ি বন্ধক দেয়ার ব্যবস্থা হিসেবে বোতলে লাল কালিতে আরবি লেখা কাগজ পুরতে লাগল। বাড়ির চার কোনায় গর্ত করে এইসব বোতল পুঁতে রাখা হবে। পুরো বাড়ি তখন আল্লার কাছে বন্ধক থাকবে, তিনি তখন বদ জ্বিন কিংবা অশুভের হাত থেকে এ বাড়ি রক্ষা করবেন।
 
আনোয়ারা খাতুন তখনও বিছানায় আধবোঁজা চোখে শুয়ে আছেন। করমদ্দিকে নিয়ে বজলুল হুদা ঘরে ঢুকলে নাজমা আক্তার ঘোমটা টেনে বসলেন, মায়ের কাপড়ের এলোমেলো অংশ ঠিক করে দিলেন। করমদ্দি আনোয়ারা খাতুনকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই বাড়ি কবে ছাড়বি ক, আল্লার কালামের দোহাই দিয়া কইতে আছি এক পলকে তোগো চাক ভাইঙ্গা দেতে পারি, ভালোয় ভালোয় কাইট্যা পর কইলাম।”
 
আনোয়ারা খাতুন চোখ মেলে তাকালেন। এরপর ঘাড় একটু ঘুরিয়ে করমদ্দিকে দেখলেন। হঠাৎ তার চোখ দপ করে জ্বলে উঠল। কণ্ঠেও যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। তার এতক্ষণের হ্যাসহ্যাসে কণ্ঠে এবার স্পষ্ট শব্দ উচ্চারিত হল, “তোর মত একটা দুধের ছ্যামরার কতায় সাত পুরুষের ভিটা ছাইর‌্যা দিমু? রহমইত্যা মুন্সির পোলা না তুই, গাব গাছে কি আর আম ধরে, তোগো দৌড় জানা আছে। এই বাড়ির দানায় দানায় আমার বীজ, মুন্সির পো, কিসসু ছেঁড়তে পারবি না কইয়া দেলাম।” এই বলে বুড়ো আঙুল নেড়ে দেখালেন করমদ্দি ওঝাকে। 
“এহনই দেহাইতে আছি আমি কী করতে পারি, ছারখার অইয়া মরবি, পালানের কোন সুযুগ পাবি না” - এই বলে করমদ্দি থলে থেকে মুঠো মুঠো বালু পুরো ঘরে ছড়িয়ে দিতে লাগল, তার সাথে ঠোঁট নেড়ে বিড়বিড় করে আরবী বাক্য আওড়াতে লাগল। 
আনোয়ারা খাতুন যেন আর্তচিৎকার করে উঠলেন, “বেশি বাড়াবাড়ি করিস না, ধ্বংস অইয়া যাবি…”।
 
বজলুল হুদা শাশুড়ির মাথার কাছে এক পা তুলে বসলেন। সূরা ফাতেহা পাঠ করে আনোয়ারা খাতুনের মাথায় তিনবার ফুঁ দিলেন, এরপর আয়াতুল কুরসীর এক একটি বাক্য পাঠ করেন আর একবার করে ফুঁ দেন। আনোয়ারা খাতুন যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। কটমটে চোখে জামাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। বজলুল হুদা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সশব্দে সূরা পাঠ করে শ্বাশুড়ীর দিকে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আনোয়ারা খাতুন আলুথালু কাপড়ে সুস্থ মানুষের মত উঠে বসলেন। মেয়ের কাছ থেকে পানের ডালা নিজেই নিলেন, বাঁশের চোঙার পান কুটুনিতে পান, সুপারি, সাদা পাতা ইত্যাদি পুরে সজোরে কুটতে লাগলেন। নাজমা আক্তার কাছে এগিয়ে এসে মায়ের পিঠে হাত রেখে বললেন, “মা তুমি শোও, তোমার শরীর খারাপ, আমি পান বানাইয়া দি...”। আনোয়ারা খাতুন খচ করে উঠলেন, “সর ছেমরি, ছুঁবি না আমারে। বিরাণ হইবে, এই পোঁতা বিরাণ হইয়া যাইবে, মাঘ মাসের বিরিক্ষের পাতার মত ঝুরঝুরাইয়া পড়বে এই ঘরের চাল, উলির বাসায় ঢাকা পড়বে ঘর, আর ফুইর‌্যা ফুইর‌্যা গজাইবে ঘাস,...” -  মুখ বাঁকিয়ে যেন অর্থপূর্ণ হাসি দিলেন। “তোরা কেউ থাকবি না, কেউ না। করমদ্দি, বালি ছিডাইয়া লাভ নাই, এই বাড়ির দহল কেউ পাইবে না, অদেষ্ট গিল্যা খাইবে…”। এই বলে দুলে দুলে হেসে উঠলেন। পান কুটুনিতে কষে কয়েকবার কুটে নিয়ে হাতের তালুতে পানটুকু ঢেলে নিলেন। সবুজ-খয়েরি রংয়ের গুঁড়া পান মুখে পুরে সজোরে চিবাতে লাগলেন। মুখের একপাশ দিয়ে লাল রস বেয়ে পড়তে লাগল। বজলুল হুদার আয়াতুল কুরসী পাঠ শেষ হতে না হতেই আনোয়ারা খাতুন শয্যা ছেড়ে মেঝেতে নেমে ছড়িয়ে থাকা বালুর ভেতর এলোপাথাড়ি হাঁটতে লাগলেন। এই সময়ে আক্তার হোসেন রানুকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। রানুর মুখ শুকিয়ে গেছে, এক অজানা আতঙ্ক ভর করেছে পুরো চোখেমুখে। আক্তার হোসেন শুধু বললেন, “তুমি কর কি”! আর কিছু না বলে বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেন। করমদ্দি সশব্দে আরবী বাক্য আওড়াচ্ছে আর আনোয়ারা খাতুনের চারপাশে বালু ছড়াচ্ছে। আনোয়ারা খাতুন যেন বেসামাল হয়ে পড়লেন, মেঝের মধ্যে ঘুরতে শুরু করলেন। করমদ্দির আওয়াজ বেড়ে গেল, সবাই নিরব দর্শকের মত নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। একরকম শঙ্কা যেন সবার ওপর ভর করেছে। ঘূর্ণনের মধ্যে আনোয়ারা খাতুনের উর্দ্ধাংশের কাপড় খসে পড়ল, মাথার মাত্র একমুঠো চুল জটাজটা হয়ে কয়েক ভাগে ঘাড়ের ওপর ছড়িয়ে গেল। ঘূর্ণনের বেগ আরও বেড়ে গেল। নাজমা আক্তার মাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য হুড়মুড় করে খাট থেকে নামতে না নামতেই আনোয়ারা খাতুন মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়লেন।
 
(৫)
তখন ধান কাটার মওশুম। কনকনে শীতের দিন হলেও সকালটা ছিল ঝকঝকে রোদ্দুরময়। বহু বারণ করা সত্ত্বেও নিলু যখন যাবেই বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন আক্তার হোসেন বেশি চাপাচাপি করেননি। তবে সাবধান করে দিয়েছেন, কোন অঘটন যেন না ঘটে, কোন ধরনের মারামারি যেন না হয়। কিন্তু ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত নিলুর আয়ত্বের বাইরে চলে যায়। নিলুও চায়নি খারাপ কিছু হয়ে যাক, শক্তি ও ভয় প্রদর্শনের বাইরে তার অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না।
 
এই জমিটি একটি ঝামেলাপূর্ণ জমি। সেনগুপ্তরা সাতচল্লিশে ভারতে পাড়ি জমাবার পর তাদের নায়েব হরিপদ দাশের মচ্ছব লেগে যায়। সেনগুপ্তরা এখানে থাকাটাকে যেমন সমীচীন মনে করেননি তেমনি এখানকার বাড়ি জমিদারী বিক্রি করাটাকেও সমীচীন মনে করেননি। ভেবেছেন, হয়ত কোনদিন ভাল সময় আসবে, আবার ফেরা হবে নিজ গাঁয়ে। কিন্তু তা আর আসেনি, সময় আর ভাল হয়ে ওঠেনি, ক্রমাবনতিই ঘটেছে কেবল। হরিপদ এই সুযোগে কিছু কিছু জমি নামমাত্র মূল্যে ছেড়ে দিতে থাকে সেনগুপ্তদের অগোচরে। সেরকম একখন্ড জমি আক্তার হোসেন কেনেন সামান্য মূল্যে এবং প্রায় বিনা কাগজ-পত্রে। ওই জমি আবার জমিদারী খাজনার বিনিময়ে বংশ পরম্পরায় ভোগ করত দ্বীনবন্ধু দাশ। কিন্তু হরিপদ ভেতরের খবর তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। দ্বীনবন্ধু যে খবর পায়নি তা নয়। নানা মাধ্যমে সে জানতে পেরেছে, জমি আক্তার হোসেন কিনে নিয়েছে। কিন্তু বাপ-ঠাকুর্দার ভোগের জমি তাকে না জানিয়ে কী করে বিক্রি হয় তা যেমন তার মাথায় ঢোকেনি, এ যাবত তার চাষবাসেও কেউ বাধা দেয়নি। তবে কানকথা নানাভাবে ভেসে এসেছে, এই জমি এখন আক্তার হোসেনের, তার আর এখানে চাষ করা চলবে না। হরিপদর কাছে জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু কোন সদুত্তর সে দিতে পারেনি। আমতা আমতা করে বলেছে, বিক্রি হয়েছে ঠিক, কিন্তু এইবার যেহেতু দ্বীনবন্ধু চাষ করেছে, এবারের ধান তার, পরেরবারে আক্তার হোসেন তাকে দিয়েই চাষ করাবে বলে তাকে কথা দিয়েছে। কই আক্তার হোসেন তো তাকে কিছু বলেনি! একটা চরম বিভ্রান্তি নিয়ে সে ফিরে এসেছে হরিপদর কাছ থেকে।
 
ধান কাটার দিন সকালে তালুকদার বাড়ির রিপন এসে খবরটা দেয়। আক্তার হোসেনের ছেলে নিলু দলবল নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে, ধান কাটতে দেবে না, যে করেই হোক প্রতিহত করবে। উল্টো সব ধান কেটে আজকের মধ্যেই নিয়ে যাবে ওরা। দিনকাল ভাল না, রিপন পরামর্শ দেয় চুপচাপ থাকতে, বিবাদে গিয়ে ক্ষতি ডেকে আনার অর্থ কী! দ্বীনবন্ধু রিপনের কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, “এডা কি মগের মুল্লুক? ধান আমি লাগাইছি, আমি কাডমু। এই জমি আক্তারের না বক্তারের হে খবর আমারে কেউ দেয় নাই। সাত পুরুষ ধইররা এই জমি চাষ করি আমরা। আর আমারে না জানাইয়া বেচা-বিক্রি অইয়া গেল? তাও বোজলাম জমিডা আমার না, জমিদারের, হে নাই বইল্যা নায়েব যা করার করবে, হেইডাও মানলাম। কিন্তু ধানডা তো আমার! ধান তো কোন বক্তারের পোয় লাগায় নাই! আমার ধান আমি কাডমু, কোন হুমকি-ধমকিতে ধান কাডা বন্ধ অইবে না কইয়া দেলাম। হারামজাদারা দ্যাশ বানায় নাইতো একটা বদমাইশের মুল্লুক কায়েম করছে!”
 
রিপন কথা বাড়ায় না, “ওইসব কী আমারে কইতে অইবে কাক্কু? খবর কানে আইছে, মনে করছি তোমারে দেওয়া দরকার, দিয়া গেলাম, বাকিডা তোমার সিদ্ধান্ত। তয় সময়ডা ভালো না, এইডুক খালি মনে রাইক্কো।”
 
এসবের পরেও দ্বীনবন্ধু নিজের ছেলে অনিল ও দুজন বদলা নিয়ে ধান কাটতে নামে। দ্রুতগতিতে ধানের গোড়া দিতে থাকে, গোড়া দেয়া শেষ হলে আগা দিয়ে আঁটি বেঁধে বাড়ি নিয়ে যাবে। যত শীঘ্র সম্ভব কাজ শেষ করতে হবে। ভেতরে ভেতরে একটা শঙ্কাও কাজ করছে, কিন্তু নিজের ঘামের ফসল, নিজের অন্ন কী করে ছাড়ে? এই ধানে ওদের কী অধিকার আছে? ওরা এলে কড়া করে বলতে হবে, এই ধান আমি লাগাইছি, আমি খামু, তোরা কেডা? এইসব নানা চিন্তা করতে করতে দ্রুত কাস্তে চালায় দ্বীনবন্ধুরা। 
 
রিপনই রুমালকে খবরটা দেয়, দ্বীনবন্ধুরা ধান কাটতে নেমে গেছে। পাকিস্তান তুলে গালাগালের কথা বলতেও বাদ রাখে না সে। 
 
নিলু, রুমাল, মোহন, লাবু, বুলু এবং আরও কয়েকজন খালের অপর পাড়ে জড় হল। দ্বীনবন্ধুরা টের পেলেও পাত্তা না দিয়ে মাথা নিচু করে ধান কাটতে থাকে। যদিও একটা অজানা আশঙ্কা দ্বীনবন্ধুর রক্তে তীরের মত খেলে যায়, তবু নিজেকে প্রবোধ দিতে থাকে, ওদের সঙ্গে অন্তত একটা ঝগড়া-টগড়া তো হবে। আর ঝগড়ায় ন্যায়কে তুড়ি মেরে পরাস্ত করা যায় না। পোলাপান মানুষ, ন্যায়-অন্যায় বোধ কমই আছে, তবু মুরুব্বীর যুক্তিরও তো একটা ভার আছে! এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে যখন নিজেকে বেশ শঙ্কাশূন্য মনে হচ্ছে ঠিক তখনই ওরা হইহই করে শীতের পানিশূন্য খাল পার হয়ে ধানক্ষেতে এসে উঠল। দ্বীনবন্ধুরা ধানকাটা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হইচইয়ের মানে বুঝতে বুঝতে দেখতে পেল বড় বড় দা হাতে ধর ধর বলে তেড়ে আসছে ওরা। প্রথমে দারুন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, এরপর সম্বিত ফিরে পেয়ে প্রাণপনে ছুটতে লাগল বাড়ির দিকে। যদিও নিলু নিরস্ত্র ছিল, কিন্তু রুমাল আর মোহনের হাতে ছিল দা। বাকীদের হাতে কাস্তে। নিলু বলে দিয়েছিল, ওদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে আমরা শুধু ধানগুলো কেটে নিয়ে আসব। সবাই দৌড়ে বাড়ি উঠে গেলেও বৃদ্ধ দ্বীনবন্ধু ধানের গোছায় পা আটকে ক্ষেতের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। রুমালের দা যখন শূন্যে ওঠে দ্বীনবন্ধু তখন প্রাণ ভিক্ষা চায়। রুমালের ক্রোধ তাতে আরও বেড়ে যায়, “শালা মালাউনের বাচ্চা, পাকিস্তান বদমাইশের মুল্লুক?”, সর্বশক্তি দিয়ে দা নামিয়ে আনে সে, পেটের ভুঁড়ি হড়হড় করে নেমে আসে, পেট চেপে ধরে হামাগুড়ি দিয়ে কিছুদূর এগুনোর ব্যর্থ চেষ্টা করে পাকা ধানের ক্ষেতেই পড়ে যায় দ্বীনবন্ধু।
 
ক্ষেতের ধান ক্ষেতেই পড়ে থাকে। নিলুর পা মুহূর্তে অসাড় হয়ে যায়, নড়তে পারে না সে। রুমাল কী সর্বনাশটা করে দিল! লাবু যখন হাত ধরে টান দেয় তখন সে সম্বিত ফিরে পায়। দলবলসহ ওরা প্রথমে নিলুদের বাড়ি গিয়ে ওঠে। আক্তার হোসেনের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে যায়। খুন! খুন করে ফেলল এরা! বৈষয়িক আক্তার হোসেন অল্প সময়ের মধ্যেই আশু কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। সবাইকে নিজ নিজ বাড়ি ছেড়ে আশেপাশের গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তার সিদ্ধান্তমত শুধু রুমাল তখনই খুলনার পথে পাড়ি দেয়। 
 
খুনের জেরে কোর্টকাছারী হয় ঠিকই, কিন্তু তখন পাকিস্তান আমল। আইন-আদালতের কাছে একটা সুনির্দিষ্ট বার্তা ছিল। চাক্ষুষ সাক্ষী অনিলকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, অভিযুক্তরা খাল পার হয়ে এলে তাদের কাপড়-চোপড় ভেজা ছিল কি না। শীতের কালে শুকনো খাল ভেজা থাকে কী করে! কিন্তু উকিলের অকাট্য দলিল, নকশামতে ওই খালটি বিশ কড়ি চওড়া। যত শুকনো সময়ই হোক না কেন দক্ষিণ অঞ্চলে এত বড় চওড়া খালে পানি থাকবে না তা কী করে হয়! উকিল আদালতকে বোঝাতে সক্ষম হলেন, সাক্ষী যা বলছে তা অসত্য।
 
আসামীরা সব বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
 
(পরের অংশে সমাপ্ত)
লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 229

মন্তব্য