slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

নিলুর নীল পাগড়ী

(১)
আনোয়ারা চিকন ক্ষীণ সুরে অজিফা পড়ছিলেন পূব দিকের জানালার পাশে বসে। ঘরের বাইরের এই দিকটায় বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। বেগুন, ডাঁটাশাক, ঝিঙে এ ধরনের কিছু সবজির অনিয়মিত চাষ হয়। একপাশে বাতাবী, অন্যপাশে পেয়ারা গাছ প্রায় একা একা। খোলা জায়গাটা পার হয়ে আরো পূবে গেলে ঘন গাছের বাগান - নারিকেল, সুপারি, রেনট্রি, মেহগনি, ছাতিম, বকুল, গাব ইত্যাদি। বিকেল নামলে গাছের সবুজ সারিতে আলো পড়ে পুরো চত্বরে একটা হলদে-লাল আভা তৈরি হয়, জানালাটা আলোতে ভরে ওঠে। এই আলোয় বই পড়া আনোয়ারার বিশেষ প্রিয়। ছোটবেলার কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে, তখন এই আলো যেন আরো লালচে আর ঝকঝকে ছিল। দুপুর গড়িয়ে গেলে যখন সবাই ঝিমাতে শুরু করত, আনোয়ারা বাবার বইয়ের স্তূপ থেকে রূপকথার কোন বই নিয়ে এই জানালার পাশে এসে বসত, কখনো পড়ত আবার কখনো ঠায় চেয়ে দেখত সবুজ-লালচে আলোর সাগরে একটা লাল ফড়িং বেগুন ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে, কিংবা হলুদ প্রজাপতি হলুদ ঝিঙেফুলে বসে নিজেই যেন একটা পাপড়ী হয়ে গেছে, আবার পাখা নেড়ে হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। 

মাঝে মাঝে যদি অনেকগুলো হলুদ প্রজাপতি উড়ত মনে হতো পুরো ঝিঙে মাচা জুড়ে যেন ফুলের পাপড়ীরা নাচছে, হাওয়ায় উড়ছে আবার মাচায় নামছে। একই রকম ঘটনা যে এখনো ঘটে চলছে না তা নয়, তবে আনোয়ারা খাতুনের চোখ এখন আর ওসব খোঁজে না। সবার ভেতরেই বিশেষ এক অনুভূতি কাজ করে যা আশ-পাশ থেকে নানারকম আনন্দ নিতে প্ররোচনা দেয়, তা আবার একসময় মরেও যেতে থাকে কিংবা পরিবর্তিত হতে থাকে। তখন আর সব কিছুতে পুলক জাগে না। প্রজাপতির ওড়াওড়ি তখন পোকামাকড়ের নিছক দৈনন্দিন জীবিকার তাড়না আর ওসবে চোখ রাখা তখন সময়ের নিস্ফল অপচয় ছাড়া বাড়তি কিছুই নয়।

আনোয়ারা পড়তে পড়তে খেয়াল করছিলেন, চোখের সামনে অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। যখন পড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে তখন তিনি মুখ তুলে দেখলেন, গায়ের আলো মুছে গিয়ে কেমন একটা থমথমে চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। অজিফা বন্ধ করে ছোট ছোট ফুলের প্রিন্টের পুরনো কালচে লাল রঙের কাপড়ে বেঁধে কয়েকবার ঠোঁটে-কপালে স্পর্শ করে উপরের তাকে তুলে রাখলেন। ঘরের ভেতরটায় অন্ধকার নেমেছে। চৌকাঠটাও এখন অস্পষ্ট রেখার মত। অনেক কালের অভ্যস্ততার কারণে চোখ বন্ধ করেও ঘরময় ঘুরে বেড়াতে পারেন আনোয়ারা। অনায়াসে চৌকাঠ পার হয়ে উত্তরের কক্ষে গেলেন। দরজা হাট করে খোলা, মুরগীর ছা-গুলো দরজার সামনে সিঁড়ির ওপর চিঁচিঁ করছে, মা মুরগীটা গলা উঁচু করে অভিভাবকের সুরে খন খন করছে আর এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। বাইরে আক্তার হোসেন শুকোতে দেয়া লাকড়ীগুলো উঠোনের উত্তর-পুব কোনায় টিনের মাচার নিচে স্তুপ করে রাখছেন। উঠোনের চারপাশের গাছের আড়াল থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কাকের ডিমের মত রঙ নিয়ে আকাশটা থমথমে হয়ে আছে, আর মাথার উপরের আকাশে সাদার মধ্যে ধুসর রঙ প্যাঁচ খেলে প্রায় স্থির হয়ে আছে। গাছের পাতা একটু একটু নড়তে শুরু করেছে, হঠাৎ গরম উবে গিয়ে কেমন একটা ঠান্ডা অনুভূতি হচ্ছে। শুকোতে দেয়া কাপড়-চোপড়, মরিচ, আচারের বয়াম ইত্যাদি ঘরে তুলে নিলেন আনোয়ারা। মুরগীগুলোকে খোয়াড়ে ঢোকালেন, কুপি জ্বেলে ঘরের জানালাগুলো সব বন্ধ করে দিলেন।

আক্তার হোসেন বাইরের কাজ-কর্ম শেষ করে ঘরে এসে হ্যারিকেন জ্বেলে সলতে নামিয়ে টিমটিমে করে রাখলেন। পেছনের দরজায় খিল লাগালেও সামনের অর্থাৎ দক্ষিণের দরজা খুলেই রাখলেন। বাতাস আসছে উত্তর থেকে। বৈঠক ঘরের এই দরজাটি কখনো ঘুমাতে যাবার আগে লাগানো হয় না। বৈঠক ঘরে আসবাব বলতে একটি চেয়ার আর একটি চৌকি। চেয়ারটি অনেক পুরনো, একটি হাতল নেই, নষ্ট হয়ে গেছে, আর সারানো হয়নি। কর্মহীন সময়ে এই চেয়ারের ওপরে বসেই সময় পার করেন আক্তার হোসেন। আজও এসে বসলেন। ভাবলেন, ঝড়ের আগমণে যে অন্ধকার নেমেছে তা সন্ধ্যায় গিয়ে মিশবে, আজ আর আলো ফুটবে না। খোলা দরজার ফ্রেমে দেখতে লাগলেন কলা পাতায় বাতাসের ঝাঁপিয়ে পড়া, কচি পাতার রংগুলো বেশ উজ্জ্বল, আধো-অন্ধকারে কেমন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে, সুপারী গাছগুলো দুলছে একপাশে। সুপারির শুকনো খোল পড়তে শুরু করেছে, নারিকেলের দু-একটা শুকনো পাতা পড়ার শব্দও পাওয়া গেল।
 
কালবৈশাখী তার সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, সেই সঙ্গে বৃষ্টি শেলের মত টিনের চালে আঘাত হানছে। প্রচন্ড বাতাস গম গম শব্দে কানে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, একধরনের শঙ্কায় বুকে বাতাসের ঘাটতি হয় আবার প্রলয়ের অনুভবে একরকম উত্তেজনা তৈরি হয়। এমন অস্থিরতায় আনোয়ারা খাতুন পুরনো ঘরটিকে সামলে রাখার একটি কৌশল আবিষ্কার করেছেন। ঘরের চতুষ্কোনে আয়াতুল কুরসি পড়ে তিনবার করে ফুঁ দেয়া। অশুভ শক্তির হাত থেকে ঘরটি যেন রক্ষা পায়। প্রথমে পূর্ব-উত্তর কোন, তারপর পূর্ব-দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম, শেষে উত্তর-পশ্চিম। শেষ কোনে এসে পড়া শেষ করে যখন প্রথম ফুঁ দিলেন, শেষ হতে না হতেই তীক্ষ্ণ ফিসফিসের মত একটি ডাক শুনতে পেলেন - ’মা’। ভাবলেন গাছের ডালে-পাতায় কিংবা টিনের চালে বাতাসের শব্দ, হয়ত ভুল শুনেছেন। দ্বিতীয় ফুঁয়ের পরেও একই ডাক, এবার যেন আরও জোর দিয়ে এবং স্পষ্ট, গায়ে না মাখলেও কান খাড়া করলেন। তৃতীয় ফুঁয়ের পরে যেন কণ্ঠটি তার অতি চেনা মনে হল। হ্যাঁ, অতি চেনা, নিজ সন্তানের গলা কে ভুলে যায়, যত শতাব্দীই পার হোক না কেন? সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুতের শিহরণ বয়ে গেল, বাহিরটাও বিদ্যুত চমকে আলোকিত হয়ে উঠল।
 
(২)
সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঝড়ও থেমে গেছে, বিদ্যুতের চমক থামেনি। তখনো বিজলি চারিদিক লালচে, নীলচে কিংবা সাদা হয়ে চমকে চমকে উঠছে, তবে শব্দহীন। মেঘরাজ্যে একরকম শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাতাস একদমই থেমে গেছে, গাছের ছোটখাট ডালপালা ভেঙে এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে, কিছু আবার গাছের সাথেই ঝুলে আছে, পাতায় সয়লাব হয়ে গেছে রাস্তাঘাট, উঠোন। লাবু আর বুলু ধীরে ধীরে চারপাশে ঝড়ের তান্ডব পর্যবেক্ষন করে করে ভেঙে পড়া ডাল-পাতা মাড়িয়ে আক্তার হোসেনদের উঠোনে এসে উপস্থিত হলো।
 
“খালুজান, আছেন নাকি?”
 
ভেতর থেকে সাড়া এল, “কেডা?
 
“খালুজান, লাবু”।
 
“বসো, আসতেছি”।
 
লাবু আর বুলু আপন খালাত ভাই। সমবয়সী বলে বন্ধুর মত সম্পর্ক। গ্রামে বিয়ে-থা পাশাপাশি-কাছাকাছি হওয়ার নিয়ম বলেই তাদের বাড়ীও পাশাপাশি। সন্ধ্যার পর তারা বেশ একটা সময় আক্তার হোসেনের সাথে কাটিয়ে যায়। এটি প্রতিদিনের ঘটনা না হলেও প্রায়দিনেরই ঘটনা। ভীষণ কাজ কিংবা অসুস্থ হলে হয়ত লম্বা ছেদ পড়ে। হালের খবরাখবর বিশেষ করে জহিরউদ্দিন মাওলানার রসালো ঘটনাবলি কিংবা নুরা আকন্দের সাথে জমি সংক্রান্ত ঝামেলার হালনাগাদ তথ্য না জানালে লাবু আর বুলুর ভাত হজম হয় না। আক্তার হোসেন খুব ভালো এবং বুঝদার শ্রোতা, দশটি কথা শুনে হয়ত একটি মন্তব্য করেন। কখনো সিদ্ধান্ত দেন না, ব্যাখ্যা করেন। ওইদিন লাবু এসে নুরা আকন্দের উপর ঝাল ঝাড়ছিল, “সম্পত্তিডা তো আমার বাপ-দাদার ভোগ-দহল করা, না কি কয়ন খালু? তুই আইল ঠেলবি, হক কতা কইলে লাডি লইয়া উডবি, মগের মুল্লুক, না? লাডি! লাডি আমরাও কোম চিনি না! রক্তারক্তি চাই না দেইখ্যা...। আমার পাঁচ কাডা বুঝাইয়া দিয়া তুই দুন্যই খা, আপত্তি নাই। আপনেগো ওই কোনার পিলার দিয়া আমাগো জমি সাড়ে একুশ নল, দাদার ধারে হুনছি, বাপের ধারে হুনছি, আপনেগো ময়-মুরুব্বিগো ধারে হুনছি। তুই নুরা কোনহাইনদা নাজিল অইয়া কও পোনে বাইশ নল? পোয়া নল জাগা কি তোর বাপ-দাদায় কিন্যা রাখছেলে না মোর বাপ-দাদায় রাখছেলে? তুই যে আইল ঠেললি, এয়ার হিসাব না দিয়া পারবি? করায়-গন্ডায় বুইজ্জা নিমু। খালু বুইজজেন কইলাম, নকশা দেহাইছি, মাপ-জোক তমাইত বুজাইয়া দিছি, হের পর আত-পাও ধইর‌্যা কইছি, মোর ভুঁইডুক তুই আল্লারস্তে ছাইড়্যা দে। বদমাইশের বাচ্চা হেই পোতে তো যায়ই না, উল্ডা বুইড়্যা আঙ্গুল দেহায়!”
 
আক্তার হোসেন বুঝিয়ে দেন, “তোমার দাদায় যহন এই জমিডা নুরার চাচার ধাইরদা কেনে, তহন পুরা পাঁচ কাডার দহল দেতে পারে নাই। এহন যেইডুক নুরা দহল কইর‌্যা রাখছে এইডুক আছিল রশিদ তালুকদারের দহলে। পরে রশিদ তালুকদারের পোলারা জমি বেচা শুরু করলে নুরার বাপ তোমাগো পাওনা ভুঁইসহ কেনে। নুরার চাচা নুরার বাপরে বইল্যা-কইয়া তোমার দাদারে পুরা পাঁচ কাডা বুঝাইয়া দেয়। এহন নুরা নামছে হের বাপের কেনা জমি উদ্ধারে। রশিদ তালুকদারের ভূত আকন্দ বাড়ি ঢোকে কেমনে বুঝি না।”
 
গ্রামের ঘটনাবলীর ইতিহাস আক্তার হোসেনের জানা। তাই দশজন এসে তার সঙ্গে কথা বলেন, আলোচনা করেন। তাৎক্ষণিক সমাধান মেলে না ঠিকই, সমাধানের দিকনির্দেশনা প্রাপ্তির আশায় নিজের জানাটাকে আরেকটু বাড়িয়ে নিতে পারেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
 
“একটু বিপীন ডাক্তারের বাড়ি যাইতে পারবা, তোমাগো খালার শরীরডা হঠাৎ খারাপ অইয়া গেছে।” আক্তার হোসেন বৈঠকঘরে ঢুকে বললেন।
 
লাবু তটস্থ হয়ে বলে, “কী অইছে খালার? দুপারেও তো দ্যাকলাম সুস্থ, আচারের আম হুগাইতে আছে!”
 
“ঝড় শুরু হইলে তোমার খালায় বোলে নিলুর গলায় ‘মা’ ডাক হোনছে, হের পরই কাঁপুনি দিয়া জ্বর, গা পুইড়্যা যাইতে আছে, জলপট্টি লাগাইতেছি, কিন্তু জ্বর তো নামে না। ডাক্তার না বোলাইলে শান্তি পামু না।”
 
“কি কয়ন খালু! ‘মা’ ডাক! নিলুর গলায়! নিলু আইবে কোনহাইনদা? খালার কায়-কারবার দ্যাকলে…! আমার কইলাম বিশ্বাস অয় না খালু। আপনের অয়?” আস্তে করে জিজ্ঞেস করে লাবু।
 
“তোমার বিশ্বাস আছিলই বা কবে!”, আক্তার হোসেন উত্তর দেন, নিজের মতামত উহ্য রেখেই। লাবু ফিক করে হেসে ফেলে।
 
বুলু বলল, “খালু ঘটনা তো ভালো মনে অইতে আছে না।  হেইলে আমরাও কি নিলুরেই দেখলাম! সুপারি বাগানের ওইধারে মনে অইল নীল পাগড়ী মাতায় কেডা যেন হাঁটুর মধ্যে মাতা গুইজ্যা বইয়া রইছে। বোলাইলাম, কোন টু-টা শব্দ নাই, লাবু কয়, ওয়া কিছু না, বিজলির আলোয় ওইরহম উল্ডাপাল্ডা দেহা যায়। লা হাওলা, লা হাওলা...। মোর কেমন ডর ডর লাগতে আছে।”
 
লাবু সাহস নিয়েই বলল, “খালার তো এমনেই ওই সমস্যা আছে, আমরা যা দেখছি উল্ডাপাল্ডাই দেখছি, একটা টর্চ দিয়েন তো খালু। কাইল একটা ওঝা-টোঝা ডাকতে অইবে। আমরা গেলাম, ল বুলু।”
 
আক্তার হোসেন কিছুটা উদ্বেগের সঙ্গে ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আচ্ছা যাও, তারাতারি আইও”।
 
লাবু আর বুলু পাঁচ ব্যাটারির টর্চ হাতে উঠানে নেমে সুপারি বাগানের দিকে যায়। বুলুর গা ছমছম করতে থাকে। বলে, “চল লাবু আগের রাস্তাইদ্যা যাই, আমার ডর করে”।
 
লাবু তার কথা শোনে না, হাত ধরে একরকম টেনে নিয়ে চলে। সে অনেকটা বাস্তববাদী, নিলুকে যাচাই করে দেখতে চায়। সে বিশ্বাস করে, নিলুর আসা সম্ভব নয়, নিলু আসতে পারে না, এই পৃথিবী ছেড়ে যে একবার চলে যায়, সে আর ফেরে না। এই জগতের সরলরৈখিক ধারায় তার অগাধ বিশ্বাস, নানাবিধ বক্রতা আর আলো-অন্ধকারের হিসাবে যে মারপ্যাঁচ রয়েছে তা তার মাথায় ঢোকে না, ঢোকাতে চায়ও না। সুপারী বাগানের ধারটা তারা টর্চ ফেলে ফেলে দেখল, বাগানের ভেতরের লতাপাতার ঝোপঝাড় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর তারা আবিষ্কার করল, মর্তমান কলার একটি চারার পাতায় একটি অতি পুরনো ছেঁড়া নীল কাপড়। আবিষ্কারের আনন্দে বিস্তৃত হাসি হেসে নীল কাপড়টা ঝট করে টেনে হাতে নিয়ে বুলুর দিকে ধরে লাবু বলে, “দ্যাখ, নীল পাগড়ী, নিলুর নীল পাগড়ী, হে হে হে হে হে”।
 
“হে হে হে হে হে, এইডা কেমন ধারা হাসি, ভালো কইর‌্যা হাস, হারামজাদা!”, বুলু কিঞ্চিত ব্যঙ্গের হাসি হাসে, তার খামচে ধরা বুক যেন একটু হালকা হয়। সেও হাসতে শুরু করে।
 
(৩)
আনোয়ারা খাতুনের মাথার কাছটায় খোলা জানালা ভরে চাঁদের আলো এসে পড়ছে। হেলে পড়া চাঁদের মরা আলো, তাতেই যেন ঘরটা ঝকঝকে হয়ে আছে। তিনি বুঝতে পারছেন না, কী করে এত নির্ভেজাল আলো ঘরে ঢোকে! কাঁঠাল পাতার ছায়ারা কোথায় গেল! মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন, জানালার পাশের বুড়ো কাঁঠাল গাছটি নেই, পুকুরের ওপারে বাঁশঝাড়টিও নেই, এমনকি পুকুরটিও নেই! বরং ধূ ধূ ক্ষেত আর ক্ষেতজুড়ে যেন জোছনার জোয়ার নেমেছে, দূর দিগন্তে গাছের রেখাকে জলরঙের ছবির মত মনে হচ্ছে। এমন অদ্ভুত ঘর তো আগে কখনও দেখেননি, এখানে তিনি কী করে এলেন, ভাবতে ভাবতে আক্তার হোসেনের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি ডাকলেন, “এই শোনছেন, আপনে কই?”
 
কিন্তু কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। তিনি এবার ওঠার চেষ্টা করলেন, পারলেন না, শরীর যেন বিছানার ওপর সেঁটে আছে। আর একটু জোরে ডাকলেন,  “কই গেলেন, শোনছেন?”
 
এবারও নিরব চারদিক। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন, এক তিল পরিমাণও সরে যেতে পারলেন না। সমস্ত ক্ষোভ এবং রাগ এক করে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “আপনে কি আছেন না মরছেন?”
 
কোথাও কোনো রা-শব্দ পাওয়া গেল না। নিস্তব্ধতা ঝিমঝিম করে আছে। ঠিক এমন সময় জানালাটা ছায়াময় হয়ে উঠল, আনোয়ারা চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন, একটা মানুষের শরীর, জানালাজুড়ে দাঁড়িয়ে তার দিকেই চেয়ে আছে। চোখটা দেখা যায় না, কিন্তু বোঝা যায় সে দৃষ্টিতে খুব বেশি অভিব্যক্তি নেই, আবেগশূন্য হলেও কঠোর নয়। অস্পষ্ট চেহারাটা অতি চেনা, অতি অতি আপন।
 
“মা, আমি নিলু। তুমি চেন নাই মা? দ্যাহো, আমি একটুও বদলাই নাই, দ্যাহো…” বলে ছায়ামূর্তিটি চাঁদের দিকে মুখ ফেরালো।
 
আনোয়ারা দেখলেন, ঊনিশ বছর আগের সেই নিলু, একটুও বদলায়নি, সেই চেহারা, চোখের নিচের হাঁড়টা একটু উঁচু হয়ে মেদহীন গালটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে চোয়ালে গিয়ে মিশেছে। চোয়ালের হাঁড়টা আন্দাজ করা যায়, এই জায়গাটা অবিকল বাপের মত।
 
একটা কান্না দলা পাকিয়ে কণ্ঠ আর তালুর মাঝখানে আটকে আছে। এটা কী বিছানায় তিনি সেঁটে আছেন এজন্য না লাপাত্তা আক্তার হোসেনের জন্য নাকি অন্যলোকে চলে যাওয়া পুত্রের আবির্ভাব ও মিলনে, বুঝতে পারছেন না। একবার প্রাণপণে ঝটকা দিলেন উঠবেন বলে, বিন্দুমাত্র নড়তে পারলেন না, মাথা ঘুরিয়ে প্রাণভরে ছেলেকে দেখতে লাগলেন, “তুই কেমনে আইলি, আইতে কোন কষ্ট হয় নাই তো?”
 
“মা, আমি তোমার জন্যই আইছি, জোছনায় ভাইস্যা ভাইস্যা আইছি। আমার কোন কষ্ট হয় নাই মা, কোন কষ্টও নাই, তয় পৃথিবীডা বড়ই সুন্দর মা, অনেক কাল পর তো, খুব ভাল লাগতেছে। এই জোছনায়, মনে হয় কি জানো, জানলার ধারে বইস্যা চাইয়া চাইয়া আবার পুস্কুনির মাঝখানের পানিতে নামা জোছনা দেহি, আর সেইখানে মাথা ডুবাইন্যা বাঁশ আর মাছের আঁৎকা ঘাউ আর আস্তে আস্তে মিশ্যা যাইতে থাহা পানির কাঁপুনি দেওয়া ঢেউ দেহি।”
 
“পাগল একটা! আমারে একটু তোল তো, আমি ওঠতে পারতে আছি না, মনে অয় কি, বিছানার লগে লাইগ্যা গেছি।”
 
“মা, তোমার এহন ওডার দরকার কি, এমনেই থাহো না।”
 
“নড়তে-চড়তে পারি না ক্যা? খুব কষ্ট লাগে তো! একটু ধর না বাবা!”
 
“আমার ধরাধরিতে কোন লাভ হইবে না মা, তুমি এহন বন্দী, তোমার আর নিজেরে নিয়া কিচ্ছু করার নাই।”
 
“বন্দী! কির লইগ্যা? আমার অপরাধটা কী? কী দোষ করলাম আমি?” ভীষণ বিরক্ত হন আনোয়ারা। আবার অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করে, কান্নার দলাটা তালুতে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।
 
“তোমার কোনই অপরাধ নাই মা, আমারই বা কী অপরাধ আছিল কইতে পারবা?”
 
আনোয়ারা যেন কিছুটা বুঝতে পারেন আবার পারেন না। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যান। যন্ত্রচালিতের মত বলেন, “ জানি না রে! সবই বুঝি অদেষ্ট! তয় এইরহম থাকতে আর ভালো লাগতে আছে না। বাবো না, ধর একটু আমারে, একটু তোল, আমারে একটু উদ্ধার কর।”
 
নিলু আর কোন প্রত্যুত্তর করে না, ধীরে ধীরে জানালা থেকে দূরে সরে যায়। চাঁদের আলো আবার গ্রাস করে আনোয়ারাকে, ঘরটা আলোয় ভরে ওঠে, তবে ঘরে যেন আর চেনা কিছুই থাকে না, সবকিছু কেমন যেন পলকা, খুলে খুলে যেতে থাকে, শিমুল তুলার মত উড়ে যেতে থাকে। আনোয়ারা তেমনি সেঁটে থাকেন বিছানায়, মাথা এদিক সেদিক ঘোরাতে থাকেন আর চিৎকার করতে থাকেন নিলু নিলু বলে, নানান অনুনয়-বিনয়, ক্ষোভ-রাগ ঝাড়তে থাকেন। নিলু আর পেছনে ফেরে না, জোছনায় মিলিয়ে যায় আর ঝড়ের মত যেন চাঁদের আলো আছড়ে পড়তে থাকে ধানের ক্ষেতে, চরাচরে। (চলবে...)
লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 254

মন্তব্য