slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

আড্ডা পূরাণ: অন্তর্ধ্যান পর্ব

ঘোর কলিকাল। নয়ত ‘বাবা’র কথা এতদিন ভূলে থাকলাম কিভাবে! সেদিন, হঠাৎ কি মনে করে গ্যারাজ থেকে সব জঞ্জাল টেনে বের করল আমার বউ। ভাগ্যিস! সেখানে ‘মিডিয়াম মনিটর’টাকে দেখেই কিনা আমার বাবা ব্লগানন্দের কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ইউরেকা মার্কা একটা চিৎকার দিয়ে যেই ওটা বগল দাবা করতে গেলাম। ওমনি হা রে রে রে তারপর আবার রে রে এবং আরও কিছুটা রে রে করে ছুটে এল বউ। এসেই আমার হাতে একটা ঝামটা মেরে বলল, ‘ঘরে বড় জোড় একটা জঞ্জাল থাকবে – হয় তুমি নয়ত ঐ কানা মনিটরটা। সিদ্ধান্ত তোমার’। আমি সাধারনত এইসব মামুলি (!) বিষয়ে নাক গলাই না। ওটা বউয়ের ডিপার্টমেন্ট। সুতরাং ফাঁদে পা না দিয়ে পোষ মানা সারমেয়র মত আত্মসমর্পণের চোখে চাইলাম। ভাবছেন, ‘বেচারা’ – তাইতো? তারমানে জাফর ভাইয়ের কথা কিছুই জানেন না আপনারা।

জাফর ভাই আমার প্রতিবেশী। প্রায়ই দেখি উনার গাল, গলা, হাত ইত্যাদি দৃশ্যমান জায়গায় হালকা হয়ে রক্ত জমে আছে। আমিও সেগুলোকে ‘বিশেষ চিহ্ন’ ধরে নিয়ে খুব পঁচাতাম তাকে। আর খানিকটা হিংসিতও হতাম। কথাটা সেদিন কথায় কথায় বউকে বলতেই সে তার ট্রেডমার্ক মুখ ঝামটা মেরে বলল, ‘পড়ের বাড়ির পিঠা, খাইতে বড়ই মিঠা - বুঝলা’। আমি বুঝি নাই লুক দিতেই, আবার বলল, ‘আরে, ভাবী ক্ষেপে গেলেই ভাইকে ধরে মার ধোর করেন। আর উনি প্রায়ই ক্ষেপে যান’। এরপরেও নিজেকে বেচারা ভেবে ঠকবার লোক আমি না।

যা হোক, ‘আমার একটা সেকেন্ড মনিটর দরকার – এটাকেই খুঁজছিলাম’ .. এ'রকম আরও ধুনফুন দিয়ে মনিটরটা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করেছিলাম। গত’রাতে সেই নষ্ট মনিটরের সামনে বসে একমনে বাবাকে খুব ডাকলাম।কিন্তু বাবা সারা দিলেন না।

অনেক রাত করে ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু ঘুম এল না। কেমন একটা ঘোর খালি। রাত গেল দু:স্বপ্ন দেখতে দেখতে। দেখলাম, অসংখ্য মানুষ হেটে আসছে। কিন্তু তাদের কারও মাথা নেই। আরও একটু কাছে আসতেই দেখি তাদের সবার হাতে চাপাতি। সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। তারপর পোকাদের আগুনে ঝঁপ দেয়ার মত তারা একে একে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে এক নীরেট অন্ধকারের ভেতর। আবার দেখলাম, একটা মাঠের মাঝখানে একটা মহীরুহ। তাতে নানা রংয়ের – গন্ধের ফুল। পাখি। প্রজাপতি। হঠাৎ একদল লোক এসে গাছটিকে ঘিরে ধরে এক ধরনের বিজাতীয় শ্লোগান দিতে শুরু করল। তারপর সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ল গাছটির উপরে।পাতা ছিঁড়ল, ডাল ভাঙ্গল। একদল গিয়ে কুড়াল দিয়ে কাটতে শুরু করল গাছটি। দেখতে দেখতে রক্তে ভরে উঠল মাঠ। ফুলগুলো ঝড়ে পড়ল। পাখিরা উড়ে গেল।মারা পড়ল প্রজাপতিগুলো আর যা কিছু বৈচিত্রময়। ধোয়া – ধুলো আর রক্তে চারপাশটা নিমিশেই তছনছ। আমি ভয়ে গুঙ্গিয়ে উঠে দেখি, বউ আমার উপর ঝুঁকে আছে। তার চোখে উদ্বেগ, মায়া আর আশ্বাসের ককটেল। আমি কিছু বলার আগেই বলল, ‘বোবায় ধরেছিল। এত ঘামছ কেন? তোমার গাটাও বেশ গরম। আজকে আর অফিস যাবার দরকার নেই।’

নাস্তা খেতে খেতেই ঠিক করলাম, আজকে যাব আমার পুরান পাড়া – ক্যাম্পসীতে। ‘বাবা’র খোঁজ বের করতেই হবে। সাত্তার ভাইয়ের দোকানে যখন পৌঁছুলাম, তখন বেলা ১০ টা। ঢুকেই দেখি, সাত্তার ভাই, গামা ভাই আর একজন অপরিচিত লোক বসে মুড়ি মাখা খাচ্ছেন। কিছু জিনিষ কোনদিনই বদলায় না। তাই প্রায় বছর তিনেক পড়ে হঠাৎ এসেও, চলমান আড্ডাটার মধ্যে ঢুকে পড়তে কোন সমস্যাই হল না আমার।

প্রথমেই এক পশলা কুশল বিণিময় হল। পরে তৃতীয় লোকটির সাথে আমাকে পরিচয় করিযে দিতে সাত্তার ভাই বললেন, এইডা আমাগো শাকিল ভাই। উনি ক্যাম্পসী শাখা ইয়ংলীগের সভাপতি। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। তার হাত ধরে আনন্দে আমার ছাতি দেড় ইঞ্চি চওড়া হয়ে গেল। বাংলাদেশের সরকারী দল এখন খালি দেশেই না বিদেশের তৃণমূলেও ভীষণ শক্তিশালী।

হাতের নাগালের মধ্যে হঠাৎ এইরকম একজন প্রায় সরকারী লোক পেয়ে আবেগে বলে ফেললাম, ভাই, মন্ত্রিসভা তো নতুন পে-স্কেলে অনুমোদন দিয়ে দিল। তিনি আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, সব আমগো ট্যাকাটুকা। রিজার্ভ ব্যাংক ফাইট্টা পড়তাছে রেমিটেন্সের টাকায়। বেতন বাড়ার পরে সরকারী কর্মচারীরা কি ঘুষ খাওয়া বন্ধ করব? করব না। শুনেন, সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতাছে। বুঝলেন? আমি ‘বুঝলাম না লুক দিতেই’ তিনি তাচ্ছিল্যের (যেন জানতেন যে বুঝব না) হাসি দিয়ে বললেন, আরে আগামী অন্তত ২০ বছর দল ক্ষমতায় থাকবো। সেই ভাবেই সব ব্যবস্থা নেয়া হইতাছে। তারপর ‘এই কথার পরে আর কথা চলে না’ স্টাইলে এক থাবা মুড়ি মুখে চালান দিলেন। আর তক্ষুণি উনার একটা ফোন আসল। মুখে মুড়ি নিয়ে হড়বড় করে তিনি যা বললেন তার প্রায় কিছুই আমি বুজলাম না। ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থাকা মানুষদের কথা তো একটু দুবোর্ধ্য হবেই। তাদের মুখ ভরা থাকলেও কদাচ বন্ধ থাকে! শাকিল ভাই ফোনে কথা বলতে বলতেই ইশারা ইঙ্গিতে বিদায় নিলেন। আমি গামা ভাইয়ের দিকে প্রশ্ন ভরা চোখে তাকালাম।

গামা ভাই একদম ফেটে পড়লেন। বললেন,‘ব্যাটা মীরজাফরের ফটোকপি। ৮/১০ বছর আগেও জামাত করত। তারপর ভোল পাল্টাইয়া এখন লীগার। কথা শুনলে মনে হয়, ওর লগে ডিসকাস না কইরা প্রধানমন্ত্রী কোন ডিশিসানই নেয় না। জীবনে এইরকম চামবাজ আর দেখি নাই। আপনারে হাসতে হাসতে কাইট্টা দিয়া যাইবগা টেরও পাইবেন না। আপনার ঘাড়ে বইসা আপনারেই ছিবড়া করব। তারপরে ফাল দিয়া যাইব আরেকজনের ঘাড়ে’।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এখন তাইলে কার ঘাড়ে?

‘অংশুর ঘাড়ে।’

কন কি? তা অংশু ভাইযের খবর কি?

‘আরে অংশু তো মাঝখানে বিরাট ফাপরে পড়ছিল। এক মার্ডার কেসে ফাইসা গেছিল প্রায়। দেশে গিয়া রইল কয়েক মাস। ফিরা আইল ইয়ংলীগের ঝান্ডা নিয়া। আইসা পেপার বাইর করছে একটা। শাকিল মালডা জুটছে লগে। তারা মাল খায় আর কলাম লেখে। পড়েন নাই।’

না পড়া হয় নাই।

নিজের অজ্ঞতায় খুব লজ্জা হল আমার। তাই প্রসঙ্গ ঘুরাতে বললাম, পড়ছেন নাকি? পার্থের ক্রাউন প্লাজা হোটেলে বাংলাদেশ ফুটবল দলের আচরণ নিয়া এক বাংলাদেশী হোটেল কর্মকর্তার ফেসবুক স্ট্যাটাসতো মিডিয়ার হৈ চৈ ফেলে দিছে।

সাত্তার ভাই এতক্ষণ কাস্টমার সামলাচ্ছিলেন। সেখান থেকেই বললেন, ‘ফাইভ স্টার এটিকেটের যে ছবক উনি দিছে, তাতে আমার কিন্তু হাসি পাইছে। মনে হইছে হোটেলের স্ট্যাটাস তার কাছে দেশের ইমেজের চেয়েও বড়।দ্যাশে হইলে ওইডারে নির্ঘাত ৫৭ ধারায় ফালাইত বস।

বললাম, হাইকোর্ট কিন্তু আইসিটি ৫৭ ধারা বাতিলের বিষয়ে রূল জারি করছে। দেখেন কি হয়।

এরপর আরও কিছু টুকটাক কথা হল। গামা ভাই আর আমি বের হয়ে এলাম। গামা ভাই বললেন, আপনি সেই যে গেলেন আর তো আসেন না এদিকে। ক্যাম্পসী হোটেলে চলেন। আপনারে আজকে লাঞ্চ খাওয়াব’।

সেদিকে হাটছিলাম, তখন গামা ভাইয়ের একটা ফোন এল। উনি বললেন, আধ ঘন্টার মধ্যে ক্যাম্পসী হোটেলে চইলা আসেন। আমি একটু ব্যাংক হইয়া আসি। ভাবলাম ভালই হল, এই ফাঁকে বাবা’র আস্তানায় একটা ঢুঁ মেরে আসব।

না বাবা সেখানে নাই। দেখে মনে হল অনেকদিন ধরেই কেউ থাকে না সেখানে। ফিরতি পথ ধরলাম। মনে মনে বললাম, বাবা, আপনাকে খুব দরকার। আপনি কোথায়? আর কি আশ্চর্য্য মাথার ভেতর স্পষ্ট শুনলাম বাবার গলা, ‘অর্ন্তধ্যানে আছি'।

কেন বাবা?

‘কি চাস বল’।

বললাম, বাবা, কেন এত হানাহানি, হিংসা? ভিন্নমতের প্রতি কেন খড়গহস্ত সবাই? ধর্মের অবমাননার অযুহাতে মানবতার অবমাননা করছে কেন মনুষ? এর থেকে মুক্তির উপায় কি?

বাবা এক কথার মানুষ, বললেন, Alt+Ctrl+Delete.

[বি:দ্র: - আড্ডা পূরাণ আমার একটি অনিয়মিত ধারাবাহিক। এর আগের পর্বগুলো এই ব্লগে পাবেন।]

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 281

মন্তব্য