slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

একদিন বৃষ্টি ঝরা রাতে

গতকাল দুপুর থেকে একটানা বৃষ্টি। বাসার ক্লপসিপল গেটের ভিতরে একহাটু পানি। সামনের ফাঁকা জায়গায় জমে থাকা পানিতে একঝাক পুটি মাছ।একঝাক মানে পনের বিশটা।মাছ গুলোর লেজ থেকে পেটের মাঝদিয়ে লাল বর্ডার।শোবার ঘরের জানালায় বসে স্বচ্ছ-পরিস্কার পানিতে পুটি মাছ! আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পাড়ে না। জানালার সামনে পানিতে রঙ্গিন পুটি মাছ! খাবার মেন্যুতে ভাজা ইলিশ (জাটকা) আর রাধুনি পাগল চালের ভূনা খিচুড়ি।বৃষ্টিঝরা আয়েশি দিনটা এরচেয়ে ভালো কাটানোর অন্যকোন উপায় ছিল না।

দিনের আলো শেষ হয়েছে অনেক আগেই।বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। আজ খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু চাইলেই তো আর হবে না। তাদেরকে রাজী করিয়ে তবেই রাস্তায় বের হতে হবে! তাকে বললাম, বাইরে যাব।সে বলল; বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ভিজে যাবা। আমি ভিজতেই যাচ্ছি একথা বলা যাবে না।বললাম, রেইনকোর্ট পরে যাব। বাসার সামনে পানি, বের হবা কি করে? সমস্যা নেই, মটর সাইকেল স্টাট দিয়ে পার হবো। মানুষের কাজকাম (আকাম অর্থে) থাকলে এই বৃষ্টির রাতে কেউ ঘরের বাইরে যায়!তোমার কিছু লাগবে? বাসায় একটাও সবজি নেই। ঠিক আছে নিয়ে আসব।

এবার দ্বিতীয় জন।আমি বাইরে যাচ্ছি।তার উত্তর; আমিও যাব।বাইরে বৃষ্টি, ভিজে যাবা।আমি ভিজে ভিজে তোমার সাথে ঘুরব? জানতাম সে এমন কথায় বলবে।আমি রেইনকোট পরে যাচ্ছি, তোমার তো রেইনকোর্ট নেই।তোমারটার ভিতরে ঢুকব!তাহলে দুইজনই ভিজে যাব। তুমি থাকো আমি বেশিক্ষণ বাইরে থাকব না। সে চুপ করে থাকে।আমি মটরসাইকেল বের করে ক্লপসিপল গেটের সামনে আসি, পেছন থেকে সে বলে; বাবা, সাবধানে যেও।

রংপুর শহর এর রাস্তাঘাট এখন অনেক ঝকঝকে। বাসা থেকে কেরানীপাড়া চৌরাস্তা মোড়ের দুরত্ব তিনশ গজ।একশ গজ সামনে বারো তের বছরের একটা ছেলে রাস্তার পাশে মাছ ধরছে।বৃষ্টির পানির শ্রোতের নিচে একটা আধা ছেড়া জাল।ছাতা মাথায় টর্চ এর আলোয় একদৃষ্টিতে সে দিকে তাকিয়ে। হেড লাইটের আলো তাকে বিচলিত করে না। মটর সাইকেলের গতি কমে আসে।আমি জমির আইল থেকে কল কল কল করে গড়িয়ে পড়া পানির শব্দ শুনতে পাই।সবুজ ধান ক্ষেত, লাঠির কোনায় বাঁধা রঙ্গিন গামছার উপর লফিয়ে পড়া পুটি আর টাকি মাছের লাফালাফি।ভেজা ঘাসের উপর দল বেঁধে কান দিয়ে লাফিয়ে চলা কৈ মাছের ঝাক।চিকন নালা বেয়ে পালাতে গিয়ে আটকেপড়া দৈত্য আকৃতির পুকুরের পোষা কাতলা।

বৃষ্টির ফোটা বড় হয়।কেরানীপাড়া চৌরাস্তা, কাচারী বাজার, মেডিকেল মোড়, বাস টামিনাল, শাপলা, জাহাজ কোম্পানি হয়ে পৌর বাজার।এমন দিনে ইলিশ শস্তা হয়।কাঁদা পানি আর অবর্জনা মাড়িয়ে মাছের বাজার।সিলভারের বড় ডালিতে কেজি দুয়েক বিশাল আকৃতির হাইব্রিড কৈ, কয়েকটা পাঙ্গাশ, মনভার করা একজন দোকানী। আমারও মনভার। ইলিশের নামগন্ধ নেই। গলি পথ ধরে পৌর বাজারের গেট।মটর সাইকেলেরে গতি বাড়ে। রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি, নিচে কর্পোরেশনের অদেখা ম্যানহোল। আড়াই বছরের মেয়েটার মুখ ভেসে উঠে। বাবা, সাবধানে যেও!

বৃষ্টির সাথে মটর সাইকেরের গতি কমে আসে।মাছ ধরা ছেলেটা এখন আর এখানে নেই।একটা টাকি মাছের পোনা কংক্রিটের পিচ ঢালা রাস্তা লফিয়ে পার হবার চেষ্টা করে।হেড লাইটের আলোয় তার পেটের নিচের রুপালী অংশটা চকচক করে উঠে।আমি একই গতিতে চলি।সদ্য পথ হারানো টাকি মাছের পোনারমত, লফিয়ে লাফিয়ে।  

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 415

মন্তব্য

শশাঙ্ক বরণ রায়-র ছবি

এহ্, একেবারে নাড়িয়ে দিয়ে গেলেন গো! ‘সদ্য পথ হারানো পোনার মতো’ আমিও যে নগরের পথে পথে ইটে ইটে খাবি খাই! আহা, সেই ঝিলমিল জলে খলবল মাছের সাথে তরবড়ে শৈশব আর সেই সর্বনাশা বেড়ে ওঠা!

........................................................

আদিবাসী বাঙ্গালী যত প্রান্তজন
এসো মিলি, গড়ে তুলি সেতুবন্ধন

হ, সর্বনাশা শৈশব। ঝিলমিল জলের খলবল মাছের সাথে তড়বড়ে সর্বনাশা শৈশব শুধু টানে! প্রকৃতি আর প্রযুক্তির পরিবর্তনে, না পরি প্রকৃতির কাছে যেতে, না পারি প্রযুক্তির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে! শুধু খাবি খাই!

মন্তব্য