slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

নিকলীঃ কিছু ছবি কিছু কথা

চামটা বন্দর থেকে আমরা যখন নিকলী বাজারে পৌছলাম তখন বেলা প্রায় ১১ টা। আমরা মানে আমি, সারোয়ার, রাহাত আর সাত্তার। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই বেশ কিছু কৌতুহলী মুখ আর তাদের উৎসুক চাহনি চোখে পড়ল। আমাদের চাইতে আমাদের সাথে থাকা ক্যামেরাগুলোই তাদের কৌতুহলের কারন। জানতে চাইল কোথা থেকে এসেছি? ঢাকার কথা বললাম। তারপরের প্রশ্ন আপনারা কোন চ্যানেলের? জবাব না দিয়ে মুচকি হেসে কিছুদুর এগুতেই টের পেলাম আমাদের পেছন পেছন ছোটখাট একটা মিছিলের মত হয়ে গেছে। হাজার হোক কৌতুহল বলে কথা।


হেলিকাপ হেলিকাপ লইয়া যাও লইয়া যাও

কাদাজল এড়িয়ে ঝাঝালো রোদের মধ্য দিয়ে আমরা যখন বাজার থেকে সামনের দিকে এগুচ্ছি তখন আকাশে যান্ত্রিক গঙ্গাফড়িঙ্গের আওয়াজ ভেসে আসল। হঠাত করেই টের পেলাম আমাদের পিছনে অনুসরণকারী শিশুরা প্রায় সমস্বরে চেচিয়ে উঠল “ হেলিকাপ হেলিকাপ লইয়া যাও লইয়া যাও”। বাড়ি থেকে, বাড়ির উঠোন থেকে, দোকান থেকে পিলপিল করে শিশুরা বেরিয়ে এসে ঊর্ধপানে মুখ তুলে দৌড়াচ্ছে আর তারস্বরে চীৎকার করছে“ হেলিকাপ হেলিকাপ লইয়া যাও লইয়া যাও”। হেলিকাপ যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। এই অবোধ শিশুদের মা, বাবা, পিতামহ তস্য পিতামহদের কোনদিন হেলিকাপ এই আহবানে সাড়া দিয়ে তুলে নিয়েছিল কিনা আমার জানা নেই কিন্তু তারপরেও তারা নাছোড়বান্দার মত উড়ন্ত হেলিকাপের পিছনে দৌড়ায় আর গলা ফাটায়। আশা নিয়ে বেঁচে থাকাই যে মানবধর্ম এই অবোধ আদমসন্তানেরা আমাদের সেই কথাই যেন মনে করিয়ে দেয়।

 

ঘুটে কুড়ানীর গল্প

মেঠোপথ দিয়ে হেটে যেতেই রাস্তার দুইদিকে চোখে পড়ে লম্বা পাটকাঠির মাথায় কাঁচা গোবর লাগানো ঘুটের সারি।মাঝ বয়স পেরোনো ঘুটেকুমার আর তারচেয়ে কম বয়সী ঘুটেকুমারীর নিবিড় যত্নে পাটকাঠিতে লাগানো ঘুটেগুলোকে মনে হচ্ছিল সারি সারি সাজিয়ে রাখা হাতিয়ার।

ক্যামেরা দেখেই ঘুটে দম্পতির থমকে দাঁড়ানো। মুখে না বল্লেও চোখের আকুতিতে বোঝা গেল তারা একটি “ফটুক” তোলাতে আগ্রহী। দেরি না করে আমিও সেই সুযোগ হাতছাড়া করিনি।


এদের দেখে আবারো মনে পড়ে
- জীবন হয় সুন্দর।


শিকারী
নাম- আপন
বয়স- ১৩/১৪ (আনুমানিক)
পেশা- পাখি শিকার ( মাঝে মাঝে স্কুলে যাওয়া)

সামনে এগোতেই এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। দেখি মাটির কিছু গুল্লি তৈরি করে রোদে শুকোতে দেয়া। কিছুটা গ্যাপ দিয়ে একগুচ্ছ গুল্লি নানা জ্যামিতিক ফর্মেশনে । কোনটার বিন্যাস চৌকো, কোনটা বা রেললাইনের মত সমান্তরাল আবার কারোটা রম্বস আকৃতির। মুহুর্তের মধ্যে করোটিতে ফ্ল্যাশব্যাক হয়। আমি ফিরে যাই আমার মতিঝিল কলোনীর কাটানো দিনগুলোতে, আমরাও গুল্লি ব্যবহার করতাম তবে মাটির নয় কাচের ভদ্রলোকের ভাষায় যাকে মাবের্ল বলা হয়। গাছ থেকে ফল পারা, মাবের্ল খেলা আর গুলতি দিয়ে পাখি শিকারের ব্যর্থ চেষ্টায় সেগুলো ব্যয় হতো। ছবি তোলার চেষ্টা করতেই দেখি ভোজবাজীর মত গুল্লির মালিকেরা এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলাম এভাবে নানা ফমের্শনে গুল্লি সাজানোর অর্থ কী? উত্তর এলো মালিকানা নির্ধারণ এবং সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা। কার্ল মার্ক্স বেঁচে থাকলে হয়ত এই শিশুদের কাছ থেকে নূতন কোন অভিজ্ঞান লাভ করতে পারতেন।
শিশুরাই পরিচয় করিয়ে দেয় এলাকার সেরা শিকারী আপনের সঙ্গে। গত তিনদিনে তিনটি বগা শিকারের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া একটা টিয়া পাখিরও নাকি লেজ খসিয়েছে। পানির মধ্যে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাঁশের মাথায় বসে থাকা ফিঙ্গে দেখিয়ে বলল কিছুদিন আগে এটারও প্রায় ইহলীলা সাঙ্গ করেছিল। চতুর আধমরা পাখি পানিতে ডুবে ফিনিক্সে পরিণত হয়েছে। আমার পাশে থাকা রাহাত দাঁত বের করে নিঃশব্দে অবিশ্বাসের হাসি হাসে আর আমি বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে দোল খেতে থাকি।

থেলিসের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন “ জল থেকেই জীবনের উৎপত্তি”।

অলস দুপুর

নিকলীতে সময় খুবই অলস। আমাদের আঙ্গুলের ফাক গলে চুইয়ে পড়া চতুর নাগরিক সময়ের খুব বিপরীত। এখানে গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে সময় বেশ ঝিম মেরে বসে থাকে।

নাগরিক জঙ্গমতার ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত সময় কাটানো নাগরিকদের চোখে কেন যেন বড় বেশি বেমানান ঠেকে। আর বেমানান ঠেকে বলেই সারোয়ারের ক্যামেরা সচল হয়। আমিই বা আর বসে থাকি কেন?

প্রত্যাবর্তন

রোদ যখন মাথার উপরে তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে আমরা গেয়ো মাটির হাওড় অঞ্চল ছেড়ে শহরমুখী হব। শিশুরা আমাদের প্রত্যাবর্তনের পথ চিনিয়ে দেয়। আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে শহরে যাবার জন্য ঘাটমুখী হই। এক ধরণের নাগরিক স্বস্তিতে আমাদের মনে পূলক জাগে। ঘাটে পৌছে গেয়ো কাদা জলে ধুয়ে আমরা নাগরিক ভব্য হয়ে উঠি। ইঞ্জিন নৌকার ভুটভুট শব্দে আমরা নিকলীকে পিছনে ফেলে আসি।

আমাদের হ্যালুসিনেশন হয়। দিগন্ত বিস্তৃত জলরেখার দিকে তাকিয়ে থাকতে বারবারই ভেসে উঠে হেলিকাপ হেলিকাপ লইয়া যাও লইয়া যাও বলে চীৎকার করতে থাকা কিছু প্রান্তিক শিশুর মুখ।

 

 

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 296

মন্তব্য