slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

নাম

 নতুন ভাড়া-বাসায় উঠেছি একমাসও পুরা হয়নি। সেদিন বিকেল বেলায় রিক্সা করে বাসার গেটের কাছে পৌঁছানো মাত্রই দেখতে পেলাম রাস্তার অপর দিক থেকে আরেকটা রিক্সা কড়া ব্রেক কষে গেটের সম্মুখভাগে এসে দাঁড়াল। রিক্সায় বসা অবস্থা থেকেই একজন মধ্যবয়স্ক লোক হেঁকে উঠল, “এই হিমেল এদিকে আয় তো।” নতুন নিয়োগ পাওয়া ষোল-সতের বছরের দারোয়ান ছেলেটি প্রায় দৌড়ে এসে মুহুর্তের মধ্যেই লোকটির বসে থাকা রিক্সার সামনে এসে হাজির। ছেলেটির পুরো মুখমন্ডল জুড়ে সেঁটে আছে বাতাসে দুলতে থাকা রাশি রাশি কচি ধান গাছের মত একটা অগোছালো গ্রাম্য ছাপ। জামরুল ফলের মত বালকটির স্বচ্ছ চোখ দুটির দিকে গাঢ় দৃষ্টি হেনে পায়ের কাছে পড়ে থাকা বাজারের ব্যাগটি এগিয়ে দিতে দিতে লোকটি জমাট বাঁধা সুরে বলল, “এক্ষুনি যা, বাজারের ব্যাগটা আমার বাসায় পৌঁছে  দিয়ে আয়।” অতঃপর লোকটি তার- অনেকটা বলা চলে, ফুলে কলা গাছের মত হয়ে উঠা- আঙ্গুল দিয়ে রিক্সাওয়ালার ছিতি পড়া, ঘামে ভেজা সার্ট লেপটে থাকা পিঠের মাঝখানটি আলতো করে ছুঁয়ে দিতেই রিক্সাটি সামনের দিকে এমনভাবে এগিয়ে যেতে শুরু করল যেন চালকসমেত রিক্সাটি এমন একটা অটোমেটিক যন্ত্র, যেটার পাওয়ার বাটন আস্তে করে টিপে দেওয়ার সাথে সাথেই নিজের কাজ করতে আরম্ভ করে।

 
ওদিকে আমি রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ছেলেটিকে ডেকে না ফিরিয়ে বরঞ্চ খানিকটা দ্রুত হেঁটে পিছন দিক থেকে যতক্ষণে আমার হাত দিয়ে তার কাঁধ স্পর্শ করেছি ততক্ষণে আমরা দুজনেই ছোট প্রবেশ পথটি দিয়ে ঢুকে পড়েছি গেটের অভ্যন্তরে। ছেলেটি ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই নরম গলায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কি হিমেল?” ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চোখের পাতা পিটপিট করল এবং তারপর তাজা চুলে ভরা মাথাটিকে নীচের দিকে নামিয়ে আনার মাধ্যমে সম্মতি জানাল; বেশ কিছুক্ষণের জন্য মাথাটিকে আর উপরের দিকে তুলল না, আমার আদুরে গলা শুনে একটু লজ্জা পেয়েছে যেন। পরমুহুর্তেই আমি যখন তাকে বললাম, “তোমার নামটি তো বেশ সুন্দর।” তখন সে আবার আমার দিকে নীরবে কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে পুনরায় চোখ নামিয়ে ফেলল, নামের প্রশংশা শুনে তাকে এবার একটু বেশী রকমভাবেই আরক্তিম হতে দেখা গেল। স্বীকার করতেই হয়- এত সুন্দর একটা নাম থাকার জন্য ছেলেটির প্রতি আমার ঈর্ষারা নদীতে ঘুরে বেড়ানো কুন্ডলী আকারের লালচে ফেনার মত আমার মনে জমে উঠতে শুরু করেছে এরইমধ্যে। আমার আফসোস হতে লাগল এই ভেবে যে, ওর বাবা-মা কত আদর করেই না তাদের ছেলের এমন চমৎকার একটা নাম রেখেছে। আর আমার নাম হল গিয়ে মেহেদী হাসান। এইটা কোন নাম হইল! এই নামের মধ্যে কোন তরঙ্গ, বক্রতা, ঝাল, প্রখরতা, বাত্যা, আলোড়ন এমনকি একটা ধাক্কা পর্যন্ত নেই। দুইটা খন্ডের বেশ বড় একটা নাম অথচ ঢোড়া সাপের মত একবার মাত্র ফণা তোলার চেষ্টা করেই নেতিয়ে গেছে। আমারও তো ছেলেটির মত অমন বাহারি একটা নাম থাকতে পারত! কি অপরুপ, মনোমুগ্ধকর নাম! হি -- মেল। নামের মধ্যে দুইটামাত্র সিলেবল- প্রথমটা যেন সমুদ্রের গর্জে উঠা সম্পূর্ণ একটা ঢেউ, আর দ্বিতীয়টা সেই ঢেউটির বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ার মত দুরন্ত একটা ঝাঁপটা। নামটি শোনার বা উচ্চারণ করার মুহুর্তেই মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে কেমন যেন একটা আন্দোলন নাড়া দিয়ে উঠে এবং শেষ হয়ে যেতে থাকা মাদকতার মত বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলতে থাকে সেই রেশ। নামটি মনে পড়তেই পাওয়া যায় একটা তেজী ভাবের মৃদু ছোঁয়া। মনে হয় নামটি হাতের তালুতে নিয়ে শুঁকে দেখলে পাওয়া যাবে কাসুন্দির মত ধারালো ঝাঁজ। এসব ভাবতে ভাবতে আমার বাবা-মার উপর একটু রাগই হল বলতে হয়, আমাকে জন্ম দিয়েই যেন বেঁচে গিয়েছে তারা, তারপর কোন এক ভবিষ্যত আউলিয়ার নামে নাম রেখে দিয়েছে ছেড়ে- যাও বাবা, এখন মেহেদী হাসান নাম নিয়ে চড়ে বেড়াও।
 
লিফটে চড়ে দশতলায় উঠার পথে হঠাৎ করে আমার মনে হলে, আরে আমার এক বন্ধুর বৌয়ের নামও তো হিমেল, যে বন্ধুটি এখন দামী চকুরির সুবাদে প্রাইভেট কারে চড়ে ঘুরে বেড়ায় এবং পরিচিত-অপরিচিত যে কারো সাথেই হোক না কেন কথা বলার সময় কোন না কোন একটা কথার সূত্র ধরে ঠিকই জানিয়ে দেয় যে তার একটা দশাসই প্রাইভেট কার আছে। ভাবলাম, এখন যদি আমার সেই বন্ধুটিকে ফোন করে বলি যে, আমার ভাড়া-বাসায় যে ছেলেটা দারোয়ানের চাকরী করে তার নামও হিমেল। কাজের তাড়ায় সদ্য শহরে আসা একটা হতদরিদ্র পরিবারের ছেলের নাম তার বৌয়ের নামে, এই ব্যাপারটি জানতে পেরে আমার বন্ধুর মেট্রোপলিটন মন সদ্য প্রত্যাখ্যাত হওয়া প্রেমিকের অন্তঃস্থলের মত কুঁকড়ে উঠবে। এসব কথা মনে করতে করতে আমার বন্ধুটির ক্লীন ইমেজের মত শেভ করা মুখ এমন একটা ভাব নিয়ে আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল যেন তার অফিসের অধস্তন কোন কর্মচারী এইমাত্র তার পাঁজরে কনুইয়ের গুঁতা দিয়েছে। সে হয়ত ভেতরে ভেতরে কিছুক্ষণ গজরাবে, বেশ প্রচলিত হয়ে পড়া এমনকি ইতিমধ্যে নিম্নবিত্তের খুপড়িতে ঢুকে পড়া তার বৌয়ের নামটি বেশ আগেই কেন পরিবর্তন করে ফেলেনি তা নিয়ে আক্ষেপের অন্ত মিলবে না, তারপর বৌয়ের অনুমতি ব্যাতিরেকেই নামটা ফেলবে পাল্টে। ঘেঁটে ঘেঁটে তার সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বউটির জন্য খুঁজে বের করবে একটা অনন্যসুলভ নাম, যাতে করে কোন দরিদ্র পিতামাতা তাদের সন্তানের রাখার জন্য এমন কোন নামের হদিস না পায় সহজে।
লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 459

মন্তব্য