slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন : নানা মাত্রা, নানা অভিঘাত ও কিছু প্রশ্ন

এবারের বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘটে যাওয়া নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা অনেককেই চমকে দিয়েছে, থমকে দিয়েছে। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান নিয়ে আমাদের যে উচ্ছ্বাস-আনন্দ-অহংকার তাতে যেন এক পোচ কালি লেপে দিয়েছে এই জঘন্য ঘটনা। মানুষ হিসেবে এবং জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের কাছেই ছোট হয়ে গেছি, অন্যের কাছে তো বটেই।

বিশেষ মাত্রা
এমন তো নয় যে এই ভূখণ্ডে নারী নিপীড়নের ঘটনা এই প্রথম ঘটল বা ঘটল বলে মানুষ জানল। তারপরও এইবারের ঘটনাটি নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মাত্রা যুক্ত করেছ্। সমাজ জুড়ে নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন এ দেশে নিত্য দিনের ঘটনা। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে দলবদ্ধভাবে এবং প্রায় বাধাহীন ঘণ্টাকাল ধরে নিপীড়নের ঘটনা আমাদের সবাইকে আয়নার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের প্রত্যেকের অবস্থানকে জবাবদিহিতার মুখোমুখী করেছে। এবং তার সাথে যুক্ত করেছে আমাদের আবহমান সংস্কৃতি-উৎসবের অহংকারের প্রশ্নটি।

মাত্রাছাড়া
আবহমানকাল ধরে চলতে থাকা নারী নিপীড়নের যে ‘ধরন’ বা ‘চিত্র’ সমাজ মোটামুটি ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে ‘মেনে’ নিয়েছে এবারের এই ঘটনা তাকে খানিকটা নাড়া দিয়েছে। তাছাড়া, অন্তত পুরুষদের কাছে, ‘কেউ কেউ বা খারাপ ছেলেরা যৌন নিপীড়ন করে, আমরা তো ভাল’ এই টাইপের ‘আত্মমুক্তি’র কৌশলটাও এবারের ঘটনায় অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে। হাজারো ‘আমাদের’ সামনে ঘটলেও ‘আমরা’ প্রতিবাদ করিনি – এটা গ্লানিকর বৈকি। ফলে, সমাজের ‘ভাল পুরুষদে’র একটা ইজ্জতের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বটে। অন্যদিকে, সমাজের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মাঝে বিরাজমান ‘মা-বোন’দের নিরাপত্তার যে সামান্য বোধটুকুও অবশিষ্ট ছিল তা যেন ভেঙ্গে পড়েছে।

অভিঘাত
একটি ঘটনা নানা জনের ওপর নানা ধরন ও মাত্রার অভিঘাত তৈরি করে। অনলাইনে জনপ্রিয় ধারার গালাগালি, যার অধিকাংশই অদৃশ্য অভিযুক্তের আত্মীয় নারীদের ওপর ভাষিক যৌন আক্রমণ, এবং ঘৃণা প্রকাশ, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আহ্বান সর্বাধিক। অন্যদিকে নারীকেই অভিযুক্ত করার চিরায়ত পুরুষতান্ত্রিক কুযুক্তি-আক্রমণ-গালাগালিও দৃশ্যমান। এদের হাতে নারীর স্বাধীন অভিগম্যতাকে রুদ্ধ করার আরও একটি অস্ত্র পৌঁছে গেল। এছাড়া অনলাইনে জনমত তৈরি ও যোগাযোগের মাধ্যমে রাস্তায় নেমে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ডাক দেওয়ার ঘটনা একটি ইতিবাচক সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।

এবারের এই জঘন্য নিপীড়নের ঘটনাটি সম্ভবত নারী মনস্তত্ত্বে একটি সুস্পষ্ট এবং বিশেষ অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। আমাদের সমাজ যেখানে যৌন নিপীড়নকে ‘অমর্যাদার’ এবং ‘গোপন করে রাখা’র বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে, সেখানে এবারের ঘটনার পর অনলাইনে অনেক নারীকেই নিজেদের ওপর নিপীড়নের ঘটনাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। সমাজের চাপিয়ে দেয়া ‘গোপন রাখ ও মেনে নাও’ জাতীয় মনস্তত্ত্ব থেকে বেড় হয়ে এসে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে নারীদের এই মুখোমখী দাঁড়িয়ে যাওয়ার চর্চাটি একটি দৃঢ় ছাপ ফেলবে বলে আশা করা যায়।

এবারের এই যৌন নিপীড়নের ঘটনাটির ভাষিক উপস্থাপনে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের জায়গাটিকে প্রশ্ন করার একটি পরিসর তৈরি করেছে। ‘শ্লীলতাহানী’, ‘সম্ভ্রমহানী’র মতো পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শকে টিকিয়ে রাখার সনাতনী মূল্যবোধসম্পন্ন ভাষিক উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন-সমালোচনা অনলাইন ও মাঠের আলোচনায় উঠে এসেছে। যৌন নিপীড়নকে নারীর শ্লীলতা বা সম্ভ্রম হারানো হিসেবে ব্যাখার পেছনে যে মূল দৃষ্টিভঙ্গী সেই একই দৃষ্টিভঙ্গী মূলত নারীকে নিপীড়নের শিকারে পরিণত করার শক্তি জোগায়। ফলে, এই প্রশ্নের জায়গাটি যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধের লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উত্তর সবারই জানা আছে, এমন কিছু সহজ প্রশ্ন
পুলিশের তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আসলে কি কাজে লাগে? ৫১টি সিসি ক্যামেরা দিয়ে কি করা হয়? মেধা বিকাশের লক্ষ্যে গভীর অভিনিবেশসহযোগে কম্পিউটার গেইম খেলা ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের আর কি করার কথা? কেন তেঁতুল শফি নারীর পোষাক এবং পুলিশ চাপ দাড়িওয়ালা লোকদের কথা বার বার বলে? নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে যারা সাংসদ হলেন এতবড় আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনায় তাদের কোন খোঁজ-খবর পাওয়া গেল না কেন? কেন নিপীড়িত হয়েও নারীরা বিচারের জন্য পলিশের কাছে যায় না? কেন মাত্র তিনটি ছেলে মার খেয়েও নিপীড়ন প্রতিরোধ করতে যায়?

পরিশেষে
অপরাধীদের শাস্তির দাবি জোড়ালো ও চলমান হোক, যাতে করে বিচার না হলেও বিচার না হওয়ার পেছনের কারণ ও শক্তি সমাজের কাছে স্পষ্ট হয়। আর শুধু অপরাধীরা নয়, যৌন নিপীড়নের সমাজ-রাজনৈতিক ভিত্তিগুলো চিহ্নিত হোক, যাতে করে লড়াই স্পষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে করা যায়। সেটাই হতে পারে কার্যকর প্রতিরোধের সূচনা।

12345
Total votes: 413

মন্তব্য