slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

বট মালী রমানালী

চৈত্র মাসের রোদ তাঁতিয়ে উঠেছে ক্ষুধার্ত বাঘের মত। তার ধারালো নখর থাবা আঁচর বসাচ্ছে চারদিকে। কিন্তু রমানালী বোধহয় তার কিছুই টের পাচ্ছে না। এই বটগাছের শীতল প্রশ্বাসে বসে থেকে তার কিছু টের পাওয়ার কথাও নয়। বাঁ কাঁধে ফেলে রেখেছে তার পাঞ্জাবি আর গায়ে বাদামি হয়ে যাওয়া হাতাকাটা সাদা গেঞ্জী। পরনে লুঙ্গী। নাভীর নিচে লুঙ্গীর বড় গিট গেঞ্জী ভেদ করে ঝুঁলে আছে। প্রতিদিনের মত রমানালী বসে আছে খালি পায়ে। হাতে তার চকচকে সাড়ে তিন হাত লম্বা বাঁশের লাঠি। আজ ঠিক বসে আছে বলা চলে না। মাঝে মাঝে উঠছে। লাঠি ভর দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে। তবে বটগাছের ছায়ার বাইরে যাচ্ছে না। ঘুরেটুরে আবার বটগাছের গোড়ায় চৌকিটার উপর এসে বসছে।

গাবতলী বাজারের ঠিক মাঝখানে এই বটগাছ। প্রতিদিন দুপুরের পর থেকে আশপাশের আট-দশটি গ্রাম থেকে বাজারিরা আসতে শুরু করে। কেউ কিনতে আসে। কেউ বেঁচতে। কেউ কেনা বেঁচা দুটোই করে। সন্ধার পর এক-দেড় ঘন্টা বাজার টিকে থাকে। বাজারের চৌকোনা উঠানটায় কেরোসিনের ছোট বড় অনেক ল্যাম্প জ্বলে উঠে তখন। মনে হয় ছোট একটা তারার মেলা, ছোট একটা রাতের আকাশ। ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে জ্বলতে থাকে সলতে। সলতের কালো ধোঁয়া বাজারময় ছড়িয়ে ধোঁয়াশাময় করে তোলে বাজার। মাটিতে ল্যাম্পের আলো, বাজারীদের দেহময় ধোয়া, মাথার উপর কোনদিন অন্ধকার, কোনদিন চাঁদ। আলো-আধারী, ধোয়াশায়-জোস্নায় মাখামাখী। স্বপ্নরাজ্য আর কাকে বলে! সাকূল্যে পাঁচ-ছয় ঘন্টার বাজার।

বাজারের পশ্চিম-দক্ষিন কোণা দিয়ে একটি পথ চলে গেছে দক্ষিন-পশ্চিমের গ্রামগুলোতে। পূর্ব-উত্তর কোণা দিয়ে আর একটি পথ চলে গেছে উত্তর-পূর্ব দিকের গ্রামগুলোতে। বাজারে ঢোকা এবং বেরুবার এই দুটিই পথ। চৌকোণা বাজারের চারদিকে কাঁচা-পাকা স্থায়ী দোকান ঘর উঠেছে ঠাসাঠাসি করে। মুদি, চা ষ্টল, স্বর্ণকার, দর্জি, কাপড়, পল্লী চিকিৎসকের ওষুধের দোকান, সার-কীটনাশক-বীজ, নৌকার যস্ত্রাংশ, জাল-সুতা, সাইকেল মেকার, কামার ঘর প্রয়োজনীয় প্রায় সবরকম দোকানের সমাহার।

বাজার চলাকালীন সময়টাতে রমানালী’কে কোনদিনই বাজারে দেখা যায় না। সূর্য ঠিক মাথার উপর উঠতেই রমানালী বাজার থেকে নেই হয়ে যায়। নেই হয়ে কোথায় যায় তার খোঁজ বাজারের তেমন একটা কেউ রাখে না। আবার রমানালী কখন বাজারে আসে তাও কেউ ঠিক মত বলতে পারে না। কারণ সকালে দেখা যায়, রমানালী চকচকে বাঁশের লাঠিটা এক বা দুই হাতে ধরে বটগাছের গোড়ায় মাটিতে পা রেখে, চকির উপর বসে আছে। সামনে দিয়ে যেই যায় তার সাথেই চলে ছোটখাট ভাববিনিময়। কই যাস? দেহিনা যে তোরে? কই থাহস? তোর মায়াডা বালো আছে? স্কুলে দিছস? কয় বস্তা ধান পাইলি? জালে মাছ পরেনি? ইত্যাদি সব ছোটখাট প্রশ্ন করে গ্রামবাসীদের খবর নেয়। আর নিজের সম্পর্কে বহু বছর ধরে একগাল নির্মল হাসিসহ একই কথা বলে যায়- তরা বালো থাকলেই অইব।

রমানালী’কে গ্রামের কেউ নাম ধরে ডাকে না। কেউ চাচা ডাকে, কেউ ডাকে দাদা। রমানালী সবাইকেই নাম ধরে ডাকে। বহু বছর ধরে গ্রামবাসী তাকে দেখছে এই বটগাছের নিচে। বহু বছর ধরে তার বয়স যেন কমছেও না বাড়ছেও না। রমানালী’র এইসব ব্যাপার নিয়ে বাজারের চা’ষ্টলে, দাওয়ার আড্ডায় গল্প উঠে, কথা হয়। তার বয়সী অনেকেই মারা গেছে কিন্তু রমানালী দিব্বি বেঁচে আছে। এমনকি তার কোন অসুখ-বিসুখ হয়েছে বলেও শোনা যায় না। তাকে নিয়ে যত কথা হয় তার প্রতি শ্রদ্ধাও তত বাড়তে থাকে। গ্রামের অনেকেই তার কাছে নানান বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসে। রমানালীও তাদের হাসতে হাসতে পরামর্শ দেয়। কখনও হাসতে হাসতে বলে- এইডা আমি কমু কেমতে? আমি কইলে কি অইব? যার বিষয় তারেই বুজতে দাও। কেউ তা মেনে চলে। কেউ মানে না। মানলে ক্ষতি হয় না। না মানলেও ক্ষতি হয় না।

বাজারের নাম গাবতলী হলেও বাজারে কোন গাবগাছ চোখে পড়ে না। বাজারে এখনও একটি গাবগাছ আছে। তবে এই গাবগাছ সহজে দেখা যায় না। পাকিস্থান আমলে এই বাজার যখন বসে তখন রমানালীর বাবাই বাজারের বেশীরভাগ জমি দান করেছিল। হাওর এলাকায় উঁচু জমির বড় সংকট। এই জমিও তখন নিচু জমি ছিল। রমানালী তখন যুবক। গ্রামের সব যুবকরা মিলে আশপাশের জমি থেকে মাটি কেটে বাজারের এই জমিটাকে উঁচু করে। এতটাই উঁচু করে যে, এত বছর পরেও এলাকার সবচাইতে উঁচু জায়গা এই গাবতলী বাজার।

মাটি ভরাটের পর রমানালীর বাবা বাজারের ঠিক মাঝখানে একটি গাবগাছের চারা রোপণ করে। লোকজন এই গাবগাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম করবে এই ভেবে। সকলের যত্নে নতুন মাটির শক্তি নিয়ে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে গাবগাছ। মানুষের মুখে মুখে বাজারের নাম হয়ে গেল গাবতলী বাজার। হাওর এলাকায় গাবগাছের গুরুত্ত অত্যাধিক। কারণ গাবের কাঁচা ফলের কষে ভিজিয়ে পাকা করা হয় নাইলন সুতার জাল। আর সেই জাল দিয়ে হাওর থেকে হাঁড়ি হাঁড়ি কাঁড়ি কাঁড়ি মাছ ধরা হয়। বিচিত্র রঙের-ঢঙ্গের-মাপের সুস্বাদু মাছ।

গাবতলী বাজারটা দেখতে দেখতে জমে উঠে। আর এ সময় দেশে শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুবক রমানালী ঘুমন্ত বাবার কাছে অনুমতি নিয়ে পালিয়ে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়। যুদ্ধ জিতে গ্রামে ফিরে আসে রমানালী। পিতার সাথে পৈতৃক পেশা কৃষি কাজ শুরু করে পুরাদমে।

বাবার লাগানো গাবগাছ’টার পাশে রমানালী এসময় ছোট একটি বটের চারা লাগায়। নিয়মিত যত্ন নেয়, খেয়াল রাখে বটগাছ’টার দিকে। দেখ দেখ করতে করতে বেড়ে উঠতে থাকে বটগাছ। এতই দ্রুত বাড়তে থাকে যে রমানালী তার সাথে তাল রাখতে পারে না। দুই-তিন বছরের মধ্যেই গাবগাছটাকে সবদিক দিয়ে ছাড়িয়ে যায়। বটগাছের প্রায় ছায়ায় চলে যায় গাবগাছ। দ্রুত ঘীরে ফেলতে থাকে গাবগাছ’টাকে। গাবগাছ’টাকে দিনে দিনে বটগাছ তার দিকে টেনে নিতে থাকে। রমানালীর মনে হয় দুই গাছের মধ্যকার দূরত্ব আগের চাইতে কমে গেছে। ব্যাপারটা চোখে পড়ার পর থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে থাকে সে। সে খেয়াল করে বটগাছ তার একটি ডাল থেকে একটি ঝুরি নামিয়ে দিয়েছে গাবগাছের উপর।

সেই শুরু। রমানালী দিনরাত প্রায় সর্বক্ষন বটগাছের নিচে বসে থাকতে শুরু করে। সে দেখে দিনে দিনে গাবগাছ’টা ঢুকে পড়ছে বটগাছের পেটে। বেশিদিন সময় নেয় না। একদিন পুরো গাবগাছ’টাকেই পেটের মধ্যে পুরে ফেলে বটগাছ’টা। বটগাছের পেটের ভিতর কোনরকমে টিকে থাকে গাবগাছ’টা। তার কয়েকটি ডাল পাতা জেগে থাকে বটগাছের ডাল পাতার অন্ধকার ছায়ার অলিতে-গলিতে।

পুরো ঘটনাটি দিনে দিনে ঘটে চলে রমানালী’র চোখের সামনে দিয়ে। রমানালী গল্প শুনেছে, আফ্রিকায় নাকি মানুষ খেকো গাছ আছে। কিন্তু গাছ খেকো গাছ এই বটগাছের গল্প কেউ করে না। হয়তো কেউ জানেও না। এবং রমানালী’র অনুমান হয় গাবতলী বাজারের এই দৃশ্য আর কারো চোখে পড়েনি। কারণ বিষয়টি নিয়ে কেউ কোন কথা বলে না। বটগাছ’টি এমনভাবে তার আহার সম্পন্ন করে যে তা কারোরই চোখে পড়ে না। এবং সকলে ভূলে যায় এখানে একটি গাবগাছ ছিল। সবার চোখের সামনে মহাদর্পে দাঁড়িয়ে থাকে বটগাছটি। তাতে অবশ্য বাজারের নাম বদলায় না। গাবগাছের খবর না রেখেও সকলে গাবতলী বাজারেই আসে।

গাবগাছ’টি খাওয়ার পর বিপুল উদ্যমে বাড়তে থাকে বটগাছ। তার ডালপালা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে থাকে চারদিকে। ডাল থেকে ঝুরি-জটা নামিয়ে দিয়ে বাজার দখলের পায়তারা করে।

বটগাছটির উপর রমানালী’র প্রচন্ড রাগ হয়। তার বাবার হাতের লাগানো গাছটি পেটে। এখন আবার বাজার দখলের পাঁয়তারা করছে। সে কয়েকবার মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় গাছটি কেটে ফেলার। কিন্তু নিজের হাতে লাগানো গাছ। কেটে ফেলতে তার মায়া হয়। নি:সন্তান রমানালী গাছটিকেই লালন-পালন করেছে সন্তানের মত। সে মরে গেলে বটগাছ’টাই তার স্মৃতি ধরে রাখবে, বটগাছ’টাকেই তার উত্তরসূরী মনে হয়।

রমানালী খেয়াল করে এভাবে চলতে থাকলে পুরো বাজারটাই একদিন সে দখল করে ফেলবে। এখানে আর বাজার বসতে পারবে না। একদিন পুরো গাছটিকে সে ভালভাবে পর্যবেক্ষন করে। দেখে গাবগাছটি এখনও বেঁচে আছে।

রমানালী এ সময় সক্রিয় হয়ে উঠে। সে প্রতিদিন বটগাছ’টির গজিয়ে উঠা নতুন নতুন ডালপালা ছাটতে শুরু করে। ছেটে দিতে থাকে নেমে আসা ঝুরি-জটা। বহুবছর ধরে নিয়ম করে এই কাজটি করে চলেছে রমানালী। এখন আর নিজে গাছে চড়তে পারে না। তাই সকালে বাজারে আসা যুবক-ছোকড়া কাউকে ডেকে তার ধাঁরালো দা’টি হাতে ধরিয়ে গাছে তুলে দেয়।

রমানালী নিচে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসে আর ডালপালা, ঝুরি-জটা কাঁটা-ছাটার নির্দেশণা দেয়। বহুবছর ধরে বটগাছটি একই রকম আছে। বাড়েও না কমেও না। গাবগাছটিও তার পেটে আগের মতই কয়েকটি ডাল পাতা নিয়ে বেঁচে আছে।

আজ সকাল থেকে রমানালী আর কাউকে ডাকছে না। কারো সাথে কথাও বলছে না। দু’একজন কথা বলতে এলে রমানালী তাদের যাচ্ছেতাই ভাষায় বকাঝকা করে। রমানালী’র এরকম মেজাজ তারা মাঝে-মধ্যে দেখে অভ্যস্ত। ফলে কেউ প্রতিবাদ না করে যে যার কাজে চলে যায়।
বহুবছর ধরে রমানালী বটগাছের ডাল-ঝুড়ি-জটা ছেটে আসছে নিয়ম করে, ধ্যানের মত। শীত-গ্রীস্ম-বর্ষা কোনিকছুই তাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। কোনকিছুই না। সে জানে বটগাছকে কেমন করে নিয়ন্ত্রনে রাখতে হয়। কেমন করে তার বাড় আটকিয়ে দিয়ে তাকে চিরবামন করে রাখা যায়।

রমানালী হাঁটে আর ভাবে, বসে আর ভাবে, বটগাছের দিকে তাকায় আর ভাবে কিন্তু মানুষের বাড় কিছুতেই আটকিয়ে রাখা যায় না। তার মনের ভিতর পাঁকিয়ে উঠা এইসব কথা, বটগাছ থেকে পাওয়া তার জীবনের শিক্ষা সে আর কাউকে বলতে পারে না। বলা হয় না। এই বটগাছটা যে এতকাল-এতবছর ধরে একইরকম আছে, তার নিজের জীবনেরও এক বিরাট সময় চলে গেল এই গাছটার পিছনে তার খবর কেউ রাখে বলে তার মনে হয় না। সে যে এত বছর ধরে এই বটগাছটার বাড় আটকাতেই কাটিয়ে দিল সে খবরও কেউ রাখে না। তবে সবাই দেখে-জানে বহুকাল বহুবছর ধরে এই বটগাছটি আর বাড়ছে না। একইরকম, একটি ছাতার মত গোল হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে ছায়া দিয়ে যাচ্ছে। গাবতলী বাজারের ঠিক মাঝখানে একটি সবুজ গোলাপের মত ফুটে থেকে বাজারের শোভা বর্ধণ করে চলেছে।

রমানালী ভাবে আর কষ্ট পায়, তার এই কাজটা কেউ ভাল করে খেয়ালই করল না। কেউ তার এ কাজের কোনই গুরুত্ত দিল না। কেউ কোন মূল্য দিল না! সে তার নিজের সংসার করেনি, সমাজের কোন কাজে সে প্রায় থাকেই না। সমাজের যে কোন প্রয়োজনে সে দৃশ্যত মূল্যহীন মানুষ। যদিও অনেকেই তার কাছে বুদ্ধি পরামর্শ নিতে আসে। সে তার বুদ্ধিমত পরামর্শ দেয়। কিন্তু সে যে বটগাছের গ্রাস থেকে গাবতলী বাজার রক্ষা করেছে তা কারো চোখেই পড়ল না। এই আক্ষেপ তাকে মাঝে মাঝে যন্ত্রনা দেয়। গ্রামের মানুষের ছোট খাট কাজে লাগা ছাড়া সে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ কাজটি করেছে বলেই তার মনে হয়।

আজ তার মনে কষ্ট-যন্ত্রনা কয়েকগুণ বেশী হচ্ছে। কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। বটগাছের নিচে বসে ছটফট করছে। মানুষের লোভ-হিংস্রতা এত বেড়ে গেছে। এত স্বার্থপর-ঘৃণ্য হয়ে উঠেছে মানুষ।

সে তার চোখের সামনে নিজের মৃত্য দেখে, এই বটগাছের মৃত্যু দেখে, জীবন্মৃত গাবগাছটির মৃত্যু দেখে, মাছের মৃত্যু দেখে, সাপ-পোকার মৃত্যু দেখে, জলের মৃত্যু দেখে, মানুষের মৃত্যু দেখে, সভ্যতার মৃত্যু দেখে। চোখের সামনের সবকিছুকে সে তখন মৃত দেখে। তার সারাজীবনের কর্ম অর্থহীন মনে হয়। জীবনকে অর্থহীন কর্মপ্রচেষ্টা মনে হয়। জীবনকে মৃতের সমগ্র মনে হয়। এতোদিনের প্রাণময় জগত্ নিষ্প্রাণ নিস্তব্ধ হয়ে যেতে থাকে তার চোখের সামনে।

এ সময় যান্ত্রিক শব্দে সম্বিত্ ফিরে পায় রমানালী। ফয়জুব্যাপারীর ছেলে সাদুল্লা তার মটর সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়ায় বটতলায়। স্টার্ট বন্ধ করে মটর সাইকেলের উপর বসেই বলে- দাদা, আমনে কামডা বেশী বালা করছেন না। মানিক তারারে আমনে কৈ বিলও বিষ দিতে না করছাইন?

রমানালী সাদুল্লা’র দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ফিকফিক হাসতে থাকে। -তুই আমারে বালা শিহাইবার আইছত? তর বাহে আমাগো যুদ্ধের বিরোধিতা করছিল্। পারছাইন? কি করছেনা তর বাপে তারা? ‌আমরা তারে না মাইরা মাফ করছিলাম। বুল অইছিল্। তুই তার পোলা এহইরহম কামকাইজ করছ।

এই বটগাছ’টা দেখছাইন? কয় বছর ধইরা, এহইরহম আছে? বাড়ছেও না কমছেও না। বলে আবার হাসতে থাকে রমানালী। তয় তরার বাইড় কমাইবার পারছি না। আটকাইবারও পারছি না। তরার চেরম্যানরে পারছি না, তরার এমপিরে পারছি না। এত কিছু দহল করছাইন, তাও তরার পেট ভরছে না। মানিক তারারা হাওর-বিলো মাছ ধইরা খায়। তরার তাও সহ্য অইছে না। বিষ দিয়া সাপ-পোহা সব মাইরা, মাছ ধরবাইন? হেরপর বিল দহল দিবাইন? মানিক তারারা কই যাইব, একবার চিন্তা করছাইন? আরে শুয়োর! চইদ্দ পুরুষ আমরা জাল দিয়া মাছ দইরা খাই। মাছের অভাব পরছেনি কুনোদিন? মানিক তারারা সারাবছর জাল দিয়া মাছ দরে। মাছের অভাব পরছে বিলো? অহন তরা বিষ দিয়া মাছ দরবি, সাপ-পোহা সব মারবি। সাপ-পোহা মাছের শত্রু? বিষ দিয়া সাপ-পোহা মাইরা মাছের চাষ করবি। তর বাপে, তুই, তরাতো সাপ-পোহার তনেও অদম। তগো বিষ দিয়া মারব কেডা? মানিক তারা পারেনা, আমি পারি না, পারি না, কেউ পারে না! বলে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে রমানালী। ভূকভূক করে কাঁদতে থাকে। মিচমিচ করে কাঁদে। ফিচফিচ করে কাঁদে। কিচকিচ করে কাঁদে। সূর্য মাথার উপর থেকে হেলে পড়ে পশ্চিমে। বাজারীরা বাজারে আসতে শুরু করে। রমানালী’র কান্না থামে না। কাঁদে আর কাঁদে। ডুকরে ডুকরে কেঁদে চলে রমানালী।

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 1280

মন্তব্য

গল্ফর শ্যাষৎ আইয়া ন জমাই দিলি। কিন্তু ফাস্টের নাইনডার অর্থ ধরা হারলাম লা। `চৈত্রমাসের রোদ চারদিকে বাঘের মত হাহা ছড়িয়ে পড়েছে।' রোইদ বাঘের নগাল হাহা করে কেমনে? বাঘ নিজেই কি হাহা করা হারে? না রোইদ পারে? হালুম হালুম একটা ব্যাফার হইতে হারতো। বা বাঘের ইশপিশাল বৈশিষ্ট কামুড় ববোহার করা যাইতো, চৈত্র মাসের রোইদ চাইরো দিক দিয়া বাঘের নগাল কামুড় দিয়া বইল। হেহেহেহেহ। তাই রূফকের ব্যাফারে লেহক ভাইরে দিষ্টি আকর্ষম দেই।

আজাদ-র ছবি

বাঘ এখন ক্ষুধার্ত, বড় হা কইরা হালুম হালুম করতাছে। অবশ্য তাতেও আমি সন্তুষ্ট হইতে পারতেছি না।

রূপক হিসাবে বাঘের ব্যবহারে আমার আগেই আরও সাবোধান হওয়া দরকার আছিল। বাঘ সম্প্রদায় শুধু কামড়ই দেয়না ক্ষমাও করে নিশ্চই..।

লেখায় আপনার মন্তব্য, লেখার তাগিদ সবসময় প্রেরণা। অনেক ধন্যবাদ।

যূথচারী-র ছবি

লেনিন ভাই ঠিকই বলেছেন, আজাদ ছেলেটি লেখে ভালো কিন্তু খুব অস্থিরচিত্ত। শেষ করার জন্য এতো অস্থির হয়ে গেলেনন কেনো? বেশ তো ধীর লয়ে বয়বৃদ্ধ এক মানুষের সাথে বটবৃদ্ধির গতিতে চলছিলাম; হঠাৎ রণডংকা! যদিও এই অকস্মাৎ ছন্দ-পরিবর্তন পাঠকের মন আন্দোলিত করে, অনুরণিত-ও।

গল্প ভালো লেগেছে। তবে মনে হয়, শেষের ঘটনাটা আরো কিছু বর্ণনা দাবি করে বলে আমার মনে হয়।

রমানালীর সাথে গলা মিশিয়ে বলে যাই- এইসব বিষ ঢেলে কোনো লাভ নাই। স্টিগলিজ রমানালীর ভাষাতেই বলেছে- শেষে তরাই আইবি কাইন্দাকাইটা এইসব বিষ পরিষ্কার করার লাইগা। গত কোপ-১৫ এর সময় গর্ডন ব্রাউনের কান্দাকাটি এই কথাটিই মনে করিয়ে দিয়েছিলো, এইবার কোপ-১৬-এও আশা করছি, আরো কিছু সাদুল্লা এবং তার বাহেরা কান্নাকাটি করবে। প্রকৃতি বড়োই আজব জিনিস- ক্ষমা বলে কোনো কথা তার ডিকশনারিতে নাই।


রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু, কেউ নেই শূন্যতা-
আকাশে তখন থমকে আছে মেঘ,
বেদনাবিধুর গীটারের অলসতা-
কিঞ্চিৎ সুখী পাখিদের সংবেদ!
আজাদ-র ছবি

দু:খিত যুথচারী, শেষের ঘটনার বর্ণনা না বাড়িয়ে পুরোটুকুই বাদ দিলাম। এবার পড়ে একটা মন্তব্য করেন।

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ!

যূথচারী-র ছবি

আগেরটাই ভালো ছিল...
 


রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু, কেউ নেই শূন্যতা-
আকাশে তখন থমকে আছে মেঘ,
বেদনাবিধুর গীটারের অলসতা-
কিঞ্চিৎ সুখী পাখিদের সংবেদ!
আজাদ-র ছবি

কইন কি?

যূথচারী-র ছবি

আপনি কি এটাকে নিয়ে সিরিজ করার কথা ভাবছেন? তা না হলে, এটা কিন্তু উপক্রমণিকাই মাত্র, কোনো গল্প নয়। এজন্যেই বলছি, আগেরটাই ভালো ছিল।

ব্যাখ্যা করি। প্রথমত, সংলাপের মধ্য দিয়ে বর্ণনার ধীর গতি ব্যাহত হয়। ধরুন আমি আপনাকে বললাম, গল্প লিখুন। বলার সময় কিন্তু আমি ওই দুটি শব্দই বললাম, কিন্তু বর্ণনার সময় আসবে, যূথচারী আজাদকে গল্প লিখতে অনুরোধ করলো, সেখানে গল্প কী, অনুরোধের ধরন, যূথচারী এবং আজাদের সম্পর্ক ইত্যাদি বিবরণ আসতে পারে। আপনার গল্পের প্রথম ভার্সনে চেয়ারম্যানের ছেলের আগমনের পর চলমান বর্ণনার ধারা থেমে গেল, কেবল দুটি সংলাপ এবং তার পর গল্প শেষ। অথচ গল্পের ধারা অনুসারে প্রত্যাশিত ছিল, চেয়ারম্যানের ছেলের আগমন তার বক্তব্যের ইতি-বৃত্তান্ত, রমনালীর জবাব এবং তার জবাবের হেতু-বিবরণ-ইতিহাস ইত্যাদি ব্যাখ্যা করা। এই বৃত্তান্ত প্রদানের ব্যাপারটি কিন্তু গল্পের যে পর্যন্ত এখন তুলে ধরেছেন, সে পর্যন্ত খুব ভালো মতোই ছিল। কিন্তু এরপর থেকেই হঠাৎ শেষ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন। সেজন্যই তখন ওই মন্তব্য করেছিলাম। কিন্তু মন্তব্যের মানে এই নয় যে, এরপর আপনি ওই অংশটাই বাদ দিয়ে দেবেন। ওই ঘটনা না ঘটলে এটি আসলে গল্প হয়ে ওঠে না, বিচ্ছিন্ন একটি লেখা মাত্র [সিরিজ হলে ভিন্ন কথা]।


রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু, কেউ নেই শূন্যতা-
আকাশে তখন থমকে আছে মেঘ,
বেদনাবিধুর গীটারের অলসতা-
কিঞ্চিৎ সুখী পাখিদের সংবেদ!
আজাদ-র ছবি

পাঠক ক্ষমা করবেন। শেষের কয়েকটি অনুচ্ছেদ বা বাড়তি গল্পটুকু বাদ দেয়াসহ ছোট খাট কিছু সম্পাদনা করলাম।

অসাধারণ বর্ণনা!!!!!!!!!!!!!!!!

আজাদ-র ছবি

ধন্যবাদ মনন'দা।

আরেফিন ফিদেল-র ছবি

তগো বিষ দিয়া মারব কেডা? মানিক তারা পারেনা, আমি পারি না, পারি না, কেউ পারে না!

আজাদ ভাই, আপনি পেরেছেন, দারুন লিখেছেন। বিস্তর হোক আপনার পথচলা। 

আজাদ-র ছবি

ধন্য ধন্য ধন্যবাদ ফিডেল....

 এত সুন্দর কি করে লিখতে পারেন আপনি। আপনার বর্ণনাগুলো পড়লে সব ছবির মত দেখতে পাই । অনেক ধন্যবাদ এমন চমৎকার লেখার জন্য ।

মন্তব্য