slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

দিনটি হোক বীথির জন্য !

প্রিয় বীথি,

তোমার পুরো নামটা আমি ভুলে গেছি। আরও ভুলে গেছি তোমার চেহারা, শুধু মনে আছে তোমার বয় কাট চুলের কথা আর লাল রঙয়ের একটা জেট প্লেন। তোমার কথাও যে খুব একটা মনে আছে তা না, শুধু মনে আছে তুমি একটা শান্ত এবং নীরব মেয়ে। পঞ্চম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিনে তোমার সাথে গোল্লাছুট খেলা, আরেকটা স্মৃতি যা এখনো ভুলি নি। তোমাকে এই চিঠি লেখার কথা ছিল ২০০১ সালে কিন্তু তখন সাহস পাইনি, আজ কেন যেন অনেক করে তোমার কথা মনে হতে থাকায় এই চিঠি লিখতে বসলাম।

তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? আমরা একই কোয়ার্টারে থাকতাম, কোয়ার্টারের ভিতরেই ছিল আমাদের স্কুল আর তুমি থাকতে নীচ তালায় ডান পাশে আর আমি তিন তালায় বাম পাশে। আমার বাবা আর তোমার বাবা একই অফিসে চাকুরী করতো আর তোমার বড় ভাই আমার বড় ভাইয়ের সাথে একই ক্লাসে পড়তো, সেই স্কুলে। আমরা একই ক্লাসে পড়তাম সেই ১৯৯১ সাল থেকে।

তুমি তো জানো, আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা যেদিন শেষ হতো, সেদিন মামা গ্রাম থেকে আসতেন আর আমাদের নিয়ে যেতেন নানা বাড়িতে। আর পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলেই কেবল বাবা যেয়ে আমাদের নিয়ে আসতের পরবর্তী ক্লাস শুরু হবার আগের দিন। এই ছিল আমাদের প্রতি বছর নানা বাড়ি আর দাদা বাড়ি বেড়ানোর ইতিহাস। আর এমনই একটা বছর ছিল ১৯৯৬; আমি আর তুমি তখন ক্লাস ফাইভে পরছি। ডিসেম্বরের কোন এক তারিখে আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হল আর সেই দিন পরীক্ষার পর পরই আমাদের স্কুল মাঠে আমারা খেলতে নেমে গেলাম, আমারা খেলছি গোল্লাছুট। আমি আর তুমি দুজনে দুই পক্ষ হয়ে; মামা বাসায় চলে এসেছেন ততক্ষণে আর খবর পেয়ে আমি খেলা শেষ না করেই সোজা তিন তালায়। মা গোসলে ঢুকিয়ে দিয়ে দুপরের খাবারের ব্যবস্থা করলেন আর খেয়েই মামার হাত ধরে আমি নানা বাড়ির বাসে চরলাম।

মাস খানেক পরে, বাবা খবর নিয়ে গেলেন, আমি পাশ। মানে প্রাইমারি থেকে হাই স্কুল; যদিও রোল নাম্বারটা একটু পিছিয়েছে কিন্তু আমি মহা খুশি কারণ আমি বড় হয়ে গেছি। একটি বারের জন্যও তোমার কথা মনে পরে নি, শুধু ব্যস্ত ছিলাম নিজেকে নিয়ে। আর তারপর নির্দিষ্ট সময়েই ষষ্ঠ শ্রেণীর প্রথম ক্লাসের আগের দিন আবার আমাদের সেই তিন তালায় ফেরত আসি এবং নতুন শার্ট পড়ে, পরের দিন সেই চেনা স্কুল; ভিতর ভিতর অনেক উত্তেজনা, বড় হয়ে গেছি আর এখন আমি হাই স্কুলে পড়ি, একটি বারের জন্যও তোমার কথা মাথায় আসে নি, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম।

নতুন বই পাবার লোভে চুপচাপ বসে আছি নতুন ক্লাস রুমে, আসে পাশে কিছু নতুন মুখ আর বকিরা আগের সেই পুরানো চেহারা, কিছু বন্ধু ঝরে গেছে গত শীতে কিম্বা নতুন ক্লাসে উত্তীর্ণ হতে না পেরে। তোমাকে না দেখে ভেবে ছিলাম এখনো বুঝি নানা বাড়িতে শীতের পিঠা খাচ্ছ। আমি বিশ্বাস করতাম তুমি ফেল করো নি, নানা বাড়ি থেকে যে কোন মুহূর্তে ফিরে আসবে।

তুমি ফিরে আস নি আর কখনো, তোমার বাবার ট্রান্সফারের খবর আমি অনেক পরে জেনেছি, তবে শুধু কষ্ট লেগেছে তোমার লাল রঙয়ের জেট প্লেনটার জন্য। কেন যেন একদিন তোমার মা আমাকে নীচ থেকে ডেকে নেয় তোমাদের বাসায় কিংবা আমি হয়তো তোমাকে খুঁজতেই তোমার বাসায় নক করায় তোমার মা এর মুখোমুখি হতে হয়; এবং হয়তো সেই দিনই আর কোন কাজ ছিলও না আমার তাই তোমার মা আমাকে বসিয়ে দেয় তোমার খেলনাগুলো দিয়ে; আমি সবকিছু ভুলে গেছি শুধু মনে আছে তোমার ছিল একটা লাল রঙয়ের জেট প্লেন। জেট প্লেনটার সামনের দিকটা একটু উঁচু, স্প্রিং দেয়া, সেটা নীচের দিকে চেপে ছেড়ে দিলেই হাজার হাজার কিলোমিটার গতিবেগে, চোখের পলকেই আছরে পড়তো সামনের দেয়ালে। সেই দিনই আমি পরিকল্পনা করেছিলাম, বড় হয়ে একটা জেট প্লেন কিনবো।

তোমাকে কখনোই আমি মিস করিনি শুধু তুমি নাই শুনে কষ্ট লেগেছিলও তোমার জেট প্লেনটার জন্য; আর সেই দিনের পর তোমার জেট প্লেনের লোভে আমি আরও কয়েকদিন গিয়েছিলাম তোমাদের বাড়িতে কিন্তু কখনোই তোমার কথা মাথায় ছিলও না। মাথায় শুধু লাল জেট প্লেন।

২০০১ সাল; আমি তখন নবম শ্রেণীর মাঝারি টাইপের একজন অনিয়মিত ছাত্র। রুল নাম্বার পর্যায়ক্রমে ১৭ থেকে ২৩ এবং পরবর্তীতে ২৭ এ যেয়ে ঠেকে। তখন হঠাৎ করে মনে হলও এই পৃথিবী শূন্য হয়ে গেছে, হঠাৎ আবিষ্কার করি তুমি নেই। সেই শূন্যটা আরও প্রকট হয় পরের বছর ক্লাস টেন এ। বারে বারে মনে হতে থাকে তুমি কই? তোমাকে আমি খুঁজতে শুরু করি আর বন্ধুদের তোমার কথা জিজ্ঞেস করতে থাকি। কেউ তোমার খোঁজ দিতে পারে নি। আজও না। এই শূন্যতা আজও পূরণ হয় নি। কেন যেন অনেক দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে তোমাকে।


আমি হয়তো সারা জীবন মিস করতে থাকবো তোমাকে আর তোমার লাল জেট প্লেনটাকে।




ইতি
শামিম
১৪ ই ফেব্রুয়ারি ২০১৪ /ডেমরা- ঢাকা
 

12345
Total votes: 652

মন্তব্য