slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

গল্পঃ অপু আর অপুর হৈম

--- তো পোলাপান, আমরা ক্যালকুলাসের "লা হসপিটাল রুলস"টা কি বুঝলাম?
দীর্ঘ ২ ঘন্টা ক্লাস নেওয়ার পর সুব্রত দা স্টুডেন্টদের দিকে একটু স্বস্তিতে তাকালেন।
--- অপু, তোর মনোযোগ কই? বাইরে কি?
--- কিছু না দাদা, এমনিতেই তাকিয়ে ছিলাম।
বোকার মতো একটা হাসি দিল অপু।
--- বুঝলি? দিন দুপুরে পরী নামে না। রাতে ট্রাই করিস।
সাথে সাথেই ক্লাসে একটা হাসির রোল বয়ে গেল। হাসিটা বোধহয় একটু বেশিই হল। কারণ, অপু ছিল গ্রুপ এডমিন। একটু চেনা মুখই বটে।
--- আচ্ছা ঠিক আছে, যা দিলাম ভালমত পড়িস। আর এই অংকটা (বোর্ডে) খাতায় লিখে রাখ, "এসো রাতে করি"। তোরা ত দিনে পড়স না, তাই এসো রাতে করি। আর অপু?
ভাইয়ার কথায় অপুর কোন মনোযোগ ছিল না। এখনও বাইরে তাকিয়ে আছে।
--- ওপু, ভাইয়া ডাকে, ওই!!!
পাশের থেকে বন্ধু তানু ধাক্কা দিল।
--- জ্বী জ্বী ভাইয়া, বলেন।
--- পরীরে পাইলে কইস, এসো রাতে করি। কারণ তুই একা পারবি না। আর না পাইলে নিজেই ম্যাথ করিস। উদাসী পোলাপান।
পুরো ক্লাসে হাসি মামার আগমন। অপু খালি সহ্যই করলো। সুব্রত দা'র ক্লাস বলে কথা। দাদার কাছে ধরা পড়লে দাদা বকেন না। কিন্তু সবার সামনে যেটা করেন তাতে মনে হয় পৃথিবীর সেরা কোন ভুল কাজ হয়ে গেসে। আর যাকে করেন তাকে মনে হয় পৃথিবীর অষ্টম আশ্চার্য। যাক সে অন্য কথা।

তো, সবার প্রিয় অপু মন খারাপ করে বাসায় এলো। এসেই কম্পিউটার। মন খারাপ হলে মনিটরের পর্দায় ভেসে উঠা ফেসবুক হোমপেজ ই ওর কাছে স্বর্গ মনে হয়। পেজ স্ক্রল করে নিচে নামাতেই একটা ছবির দিকে অপুর চোখ আটকে গেল। ছবিতে একটি মেয়ে, নাম অঙ্কিকা। মেয়েটি শাড়ি পরা। চুলগুলো খোলা, খুব সুন্দর, রেশমী, কাজল দেয়া চোখের মণিটা হালকা সবুজ। আর সাথে মিষ্টি একটা হাসি। অপু বুকের ভিতর একটা চাপ অনুভব করলো। মুহুর্তেই ওকে ভালো লেগে গেল। বিশেষ করে ওর সবুজ চোখ জোড়াকে। কিভাবে কি হল অপু বুঝতে পারলো না। আরও তো কত মেয়ের সাথে দেখা হয় কথা হয়, কিন্তু ও আলাদা কেন? মনের মাঝে হাজারো চিন্তার কারখানা।
--- অপু, খেতে আসো।
--- আসছি মা।

--- ফোর এক্স প্লাস বি কিউব ডিফারেন্সিয়েট করলে আসে……।, উফ্। ভালো লাগছে না।
বই খাতা বন্ধ করে অপু চিন্তা করতে লাগলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো অঙ্কিকা র ছবি। সেই চোখ, সেই হাসি। অতঃপর অপুর ফেসবুকে প্রবেশ। অঙ্কির চ্যাট বক্সটি ওপেন করে অপু ভাবতে লাগলো।
--- কি লেখবো? হাই নাকি হ্যালো। নাকি কেমন আছো। নাকি কি খবর।
এভারেস্ট সম চিন্তার মধ্যে অপু পরে গেল। অতঃপর মহারাজ এভারেস্ট জয় করে চ্যাট বক্সে টাস্কবার রেখে ক্লিক করলো, এবং লিখলো,
--- কিরে? কেমন আছিস? ভালো তো?
ওওওও, সরি সরি ভুলে দিয়ে দিসি।
কিন্তু অঙ্কির আর তা দেখা হল না। অঙ্কি অফলাইন। Damn....

পরদিন সকালে রিপ্লাই এলো, "lol" .অপু তো ভারী খুশি। আর ঠিক এভাবেই ভার্চুয়াল লাইফে তাদের কথাবার্তা চলতে লাগলো। কোথায় থাকে, কোথায় পড়ে আরও কত কি। একদিন অপু ফোন নাম্বার চায়। অঙ্কিও দিতে দ্বিধাবোধ করলো না। তাদের কথাবার্তায় নতুন মাত্রা যুক্ত হল। মোবাইল।

--- আচ্ছা, মেয়েটা এতো সুন্দর করে কথা বলে কেন? কেমন জানি একটা মায়াবী টান ওর কন্ঠে। কথার ভিতরেই বুঝি আরেক কথা আছে। আচ্ছা, মেয়েটা কি আমাকে পছন্দ করে? কিন্তু ও তো বলেছেই ভার্চুয়াল লাইফে ওর বিশ্বাস নেই। তাহলে ভার্চুয়াল রিলেশন ……?
এসব ভাবতে ভাবতে অপু মোবাইলের ছবিটার দিকে তাকালো। শাড়ি পরা ছবিটি। মেয়েটার হালকা সবুজ চোখ জোড়া যেন প্রতিনিয়তই তাকে আহবান করছে।
--- নাহ, এভাবে আর থাকা যায় না। ওর সাথে আমার দেখা করতেই হবে। যেভাবেই হোক। কিন্তু কিভাবে?
মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো, সাথে বিরক্তিকর ভাইব্রেশন। কিন্তু স্ক্রিনে যখন অঙ্কির নাম লেখা তখন তো এসব কিছুই না।
--- হ্যালো অঙ্কি?
--- অপু, তুমি কি পরীক্ষার প্রশ্নগুলো আমাকে দিতে পারবে?
অপুর মাঝে যেন একটা তড়িৎ বয়ে গেল। এটাই তো সে চাইছিল। এই সুযোগে না হয় একটু দেখাও হবে।
---হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমি কাল ১০ টায় চলে এসো।
--- ঠিক আছে।
অপুর এমন খুশি দেখে ঘুম কুমারী সেই রাতে ঘুম নিয়ে ওর কাছে আর আসলো না। আসলো ভোরে।

ঘড়ির হিসাবে সকাল ১০ টা বাজে। মোবাইলের ভাইব্রেশনে অপুর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ না খুলেই রিসিভ করলো,
--- হ্যালো, কে?
--- অপু তুমি কোথায়? আর কতক্ষণ এখানে দাড়িয়ে থাকবো।
--- এইতো আসছি আমি। ১ মিনিট।
ফোন রেখে দিল অপু।
--- উফ্, আমিও না একটা ……

চটজলদি রেডী হয়ে অপু জায়গা মত পৌছালো। কিন্তু অঙ্কি কোথায়? কিছু দূরে অপু একটা মেয়েকে দেখতে পেল। যে কিনা তাকে দেখেই হাসছে। অপু সামনে যেতে যেতেই দেখলো, দুটি সবুজ চোখ তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। বুঝার বাকি রইলো না, এই সেই রাজকন্যা।
--- কেমন আছো, মহারানী?
ইসস, মুখটা আর কন্ট্রোলে থাকে না।
--- হুম, ভালো আছি। প্রশ্ন কই? এনেছো?
--- হ্যাঁ, এই নাও।
অপু প্রশ্ন দিল। তারপর দুজন কি করবে কেউই জানে না। দুইজনই দাড়িয়ে আছে। দুজনই কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
--- অপু, আমার বাসায় যেতে হবে।
--- চল এগিয়ে দিয়ে আসি।
অঙ্কি আর না করলো না।
--- চল।
অঙ্কির সেই হাসি একচিলতেই অপুকে স্বর্গে নিয়ে গেল এমন একটা অবস্থা। আর সাথে সম্মতি আরেক মাত্রা যোগ করলো।

রাতে একপশলা বৃষ্টির পরে উদ্যম বাতাস পরিবেশ কে আরও সুন্দর করে তুলেছে। দুজন রিক্সায় বসে আছে। আর সংসদভবন এলাকার ফাকাঁ রাস্তায় রিক্সাকে গাড়িও বলা যায়। শীতল বাতাসে অঙ্কির চুলগুলো উড়ছে। আর সেগুলো অপুর গায়ে লাগছে। ওর মুখে, ওর শার্টে। অপু অঙ্কির দিকে তাকিয়ে হাসলো।
--- জীবনটা ত খারাপ না।
--- কি? কিছু বললে?
অপু অঙ্কির দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। কি সুন্দরই না লাগছে ওকে। সবুজ চোখেই বুঝি স্বর্গের আভাস পাচ্ছে অপু। কি অপরূপ। মনে হচ্ছে প্রাণ ভরে দেখি। অঙ্কি অপুর দিকে তাকালো। অপু কল্পনা থেকে বাস্তবে এলো। ও সামনে তাকালো।
--- না মানে বলছিলাম কি, জীবনটা খারাপ না।
--- হ্যাঁ, খারাপ না, তবে চাওয়ার উপরে নির্ভর করে। কি পেতে চাও জীবনে?
--- এক জনের গাল ছুয়ে যেতে, শুধু একটা স্পর্শের অনুভূতি নিয়েই হয়তো কাটিয়ে দেয়া যাবে আরেকটা জীবন।
অঙ্কি হাসলো। কি আছে ওর হাসিতে? অপু ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শুধু তাকিয়েই রইলো।
--- কেন? দু চোখ দিয়ে কি পৃথিবী দেখতে চাও না?
--- পৃথিবীর নতুন আর কি আছে? যা ভবিষ্যৎ তাই বর্তমান, যা সবুজ তা চিরকালই সবুজ। সবকিছু একই থাকবে। কিন্তু অনুভূতি তো সবসময়ই ভিন্ন। আর এটা তো চোখ দিয়ে দেখা যায় না। মন দিয়ে বুঝতে হয়।
আবারও সেই হাসি। মায়াবী মধুর মিষ্টি এক হাসি। এই হাসিতে না জানি লুকিয়ে আছে কত কথা, কত আনন্দ। হাসি থামিয়ে অঙ্কি অপুর দিকে তাকালো।
---তো মিষ্টার, দিনদুপুরে আপনার জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা কি থামবে?
হাসতে হাসতে অঙ্কি সামনে তাকায়।
--- দিনদুপুরে যদি আকাশ থেকে পরী এসে রিক্সায় আমার পাশে বসে থাকতে পারে তাহলে আমি কেন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে পারবো না?
আস্তে আস্তে অঙ্কির হাসিটা থেমে গেল। অপুর দিকে তাকালো।
--- অপু তুমি কি বলতে চাও, বল তো?
প্রশ্ন টা একটু গম্ভীর গলাতেই না বললো। অপু সামান্য ভয় পেয়ে গেল। "অঙ্কি বোধহয় আমাকে পছন্দ করে না, বোধহয় একজন ভালো বন্ধুর মধ্যেই রাখতে চায়। নাকি পারিবারিক কোন বাধ্যবাধকতা।" অপু নানারকম চিন্তা করতে লাগলো। অঙ্কি মুখ ফিরিয়ে নিল।
--- কি হল? বলছো না.……
অঙ্কি শেষ করতে পারলো না।
--- আমি তোমাকে ভালবাসি অঙ্কি।
অঙ্কি অপুর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চারিদিকে পিনপতন নিরবতা। কোন সাড়াশব্দ নেই। অঙ্কি মুখ ফিরিয়ে নিল। অপু তাকিয়ে ছিল অঙ্কির চোখের দিকে। মানুষের চোখ আর চেহারাও নাকি কথা বলে। কিন্তু অপু তো তার কিছুই দেখছে না।

--- ভাইয়া, রিক্সাটা থামান তো।
--- কি হল? এটা তো লেক রোড। এখানে বাসা কই? এখানে থামালে যে?
অঙ্কি রিক্সা থেকে নেমে গেল। এমন টা যে হবে অপু কখনো ভাবতেও পারে নি।
"ইস, কেন যে কথাটা বলতে গেলাম? কিন্তু মন তো কোন ক্যালকুলেশন বুঝে না।" অঙ্কি ফুটপাতে গিয়ে দাঁড়ালো। অপু এখনও রিক্সায় বসে ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
--- আরে বোকা, সারাক্ষণ কি রিক্সাতেই থাকবে? হাত ধরে হাঁটবে না?
অঙ্কি কথাটা বলেই হাসতে লাগলো। অপুর ঠোঁট যুগল ও তার হাসি আটকাতে ব্যার্থ হল। কি সব চিন্তাই না করছিল ও। অপু রিক্সা ছেড়ে নামলো।
--- মহারানী, আপনার হাতটা ধরেই কাটিয়ে দিতে চাই বাকিটা জীবন। আপনি কি রাজি?
অঙ্কি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো,
--- হ্যাঁ

আর অপু মনে মনে বললো, "দেখ সুব্রত দা, দিনদুপুরে পরী ঠিকই নেমে আসে। তবে সবার কাছে না। অপুর হৈমরাই অপুর কাছে আসে।"

(গল্পটির ২০% বাস্তব আর বাকি ৮০% কাল্পনিক। অপু আর অঙ্কিকার জন্য রইলো শুভকামনা)

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 636

মন্তব্য

আজাদ-র ছবি

অভিনন্দন উন্মোচনে. . .

মন্তব্য