slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

দিঘির নাম, রামসাগর !

ঈশ্বরের সাথে একধরনের অভিমানের সম্পর্কে জড়িয়ে যায় হারু। ঈশ্বরকে হুদাই দোষ দিতে থাকে কিম্বা আসলে হুদাই না; যে কারণে দোষ দিতে থাকে সেই কারণটাই হয়তো পরবর্তীতে হুদা মনে হইতে থাকে; এমন সময় কোন এক রাতে অথবা দিনে এমনকি সন্ধ্যায়, ঈশ্বরের দেখা মেলে! একটি দৈব আওয়াজে ঈশ্বর তার উপস্থিতি জানান দিলে হারু ঈশ্বরের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। শুরুতেই হারু তার অসহনীয় জীবনের জন্য দোষারোপ করে ঈশ্বরকে, সেই সাথে যত অপ্রাপ্তি আর হতাশা সবকিছুর জন্য ঈশ্বরই একমাত্র দায়ী মর্মে বিভিন্ন বিষয়ে জবাবদিহি করতে থাকে; ঈশ্বরকে যতই প্রশ্ন করে ঈশ্বর তার জবাবে শুধু হাসে, আর তাতে হারুর মেজাজ খারাপ হয়ে যেতে থাকে আর ঈশ্বরকে আরে বেশী বেশী প্রশ্ন করতে থাকে এবং ঈশ্বর তার কোনটিরই জবাব না দিয়ে কেবল হাসতে থাকে। হারুর সহিত ঈশ্বরের এইরূপ উপহাসে হারুর চোখে জল আসে, এক পর্যায়ে হারুর চোখে জল দেখিয়া ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দেয় হারুর সাথে প্রশ্ন উত্তরে বসবেন, তিনি মুখোমুখি হবেন, তবে একটি শর্ত; হারু যদি সম্মত হয় তবে মাঠের অপর প্রান্তে ঈশ্বরের সাথে দেখা হইতে পারে, আলাপেও প্রস্তুত তিনি, তবে এই মুহূর্তে মাঠের এই প্রান্তে হারুর সাথে আলাপে আগ্রহী নন তিনি ! ঈশ্বর আবার হাসিলেন। হাসতে হাসতে হারুর সামনের জায়গাটা বিশাল একটা সবুজ মাঠে পরিণত হইল আর সেই দৈব আওয়াজ বাতাসে মিলায়ে গেল; হারু এতো বড় মাঠ পাইয়া দৈউড়াইতে আরম্ভ করিলও, আছাড় খাইয়া পরিলও আর মাঝে মাঝে ডিগবাজি খাইলও, ডিগবাজি খাইতেই থাকিলও। উত্তেজনা ক্রমশ কমিয়া আসিলে হারু স্থির হইলও, মাঠের অপর প্রান্তে যাইবার জন্য প্রস্তুতি লইতে থাকিলও।

হারুর হটাত মনে হইল ঈশ্বর তাহার সহিত পুনরায় উপহাস করিতেছেন, তা না হলে এমন একটা মাঠ পার হইবার সর্ত কেন? হারু ছোট বেলায় এর চাইতেও তিন গুন বড় মাঠ, বৃষ্টির দিনে, কাদা পায়ে লাগাইয়া,শরীরে বৃষ্টি নিয়া, হোঁচট খাইয়া পড়িয়া আবার খাড়া হইয়া ফুটবল লইয়া দৌড়াইয়া বেড়াইছে আর এখন এই নিতান্ত অপেক্ষাকৃত ছোট আর সবুজ নরম ঘাসযুক্ত মাঠ পার হইবার এই শর্ত উপহাস ছাড়া আর কি হইতে পারে? একই সাথে ঈশ্বরের মনোভাব বুঝিবার তরে হারু আরও ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ভাবতে শুরু করলও। এই পৃথিবীর মাঠ বিষয়ক যত স্মৃতি আর কল্পনা সকল একত্র করিয়াও কোন কুল কিনার করিতে পারিলও না, এমন কি ঈশ্বরের এই মাঠ পার হইবার পরীক্ষাটা কেন একটা শর্ত সেটাও ভাবিতে লাগিলও! ধোঁয়াশা কুয়াশায় হারুর মনে পরে সোফিয়ারে নিয়া একখানা লম্বা রাস্তায় হাঁটিয়া যাইবার দৃশ্য, যদিও সেই লম্বা রাস্তার পাশে রামসাগর বলিয়া একখানা দিঘি ছিল যা এই মাঠের ন্যায় বিশাল এবং সেইটা এক কুয়াশার রাত ছিল, আকাশে পূর্ণিমা ছিল, এবং যেহেতু সেই পূর্ণিমার আলে দিঘির উপরে জমে থাকা কুয়াশায় প্রতিফলিত হয়ে একটা রুপালী ফুটবল মাঠের অবয় তৈরি করলও, সেহেতু হারু আর সোফিয়া সেই দিঘিকে মাঠ বানাইয়া মাঝে মাঝে দুইজন দুইজনরে দৈরে যাবার প্রস্তাব দিয়েছিল, আর হাসা-হাসি করেছিল। কিন্তু ঈশ্বর নিশ্চয়ই সোফিয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এই মাঠের আয়োজন করেন নাই কারণ হিসাবে বলা যাইতে পারে , সোফিয়া আর বেঁচে নাই এবং ঈশ্বর নিশ্চয়ই হারুকে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করবেন না কারণ ঈশ্বর জানেন; সোফিয়ার আত্মহত্যায় হারু কতটা কষ্ট পেয়েছিল।

কচি ঘাসের সবুজ মাঠের এ প্রান্তে দাঁড়াইয়া হারু যখন মাঠ পার হইতে প্রস্তুত তখন তার খেয়াল হল, সোফিয়ার স্মৃতিতে তার চোখ ভিজে উঠে; হারু সোফিয়াকে বুকে লইয়া ঈশ্বরের মুখোমুখি হইবার উদ্দেশ্যে মাঠের ভিতরে পা ফেলে। হারুর মাঠ যাত্রা শুরু হয়। ততক্ষণে পশ্চিমের আকাশে হেলে পরে সূর্য আর কুয়াশার পাল একটু একটু করিয়া মাঠে জমতে শুরু করে। কুয়াশার অস্পষ্টতা যেন চোখের পানির সাথে একত্রিত হয়ে দৃষ্টিকে করে তোলে আরও ঘোলাটে; সামনের মাঠটা এখন আর স্পষ্ট দেখা যায় না শুধু শব্দ শোনা যায় এবং এই অবস্থায় হারু সামনের দিকে আগাতে থাকে। কিছু দুর যেতেই হারু একটা মেলার সোরগোল শুনতে পায় এবং সেই সোরগোল বরাবর চলতে থাকে। কুয়াশার ভিতর দিয়ে আসা মেলার লাল নীল আলো হারুকে মনে করিয়ে দেয় শেফালীর কথা। এমন এক রাতেই চারিদিকে লাল নীল আলো জ্বালিয়ে শেফালীর বাবা শেফালীকে বিয়ে দিয়ে দেয় গঞ্জের বিশাল চাউল ব্যবসায়ীর কাছে। শেফালীর এই বিয়েতে কোন আপত্তি ছিল না আর হারুও মেনে নেয় সব কিছু তবে সেইটা তো বহুদিন আগের কথা!

হাটতে হাটতে আলোর আরও কাছাকাছি যেতে যেতে হারু চারিদিকে মাইকের শব্দ শুনতে পায় আর বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়ে, পুরুষ নারীর হাসা-হাসি,কথা-বার্তা, এবং হট্টগোল শুনতে পায়; শুনতে শুনতে আরও কাছাকাছি যেতেই হটাত হারু দেখে খইলশা মাছ হাতে একটা মেয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হারু মুহূর্তেই সেই মেয়েটিকে চিনে ফেলে যদিও আজ মেয়েটি শাড়ী পরে দাড়িয়ে আছে। মেয়েটি সুন্দর গোলাপি রঙয়ের একটি শাড়ি পরে আছে সাথে কপালে ছোট কালো একটা টিপ, ঘাড়ে ঝুলছে একটা ঝোলা ব্যাগ; হারুর চোখে চোখ পরতেই মেয়েটি তার দু হাতে ধরে রাখা খইলশা মাছ দুটি তার ঝোলা ব্যাগে ঢুকিয়ে হাটা দেয় এবং হারুর চোখের আড়াল হয়ে যায় মুহূর্তেই। হারু পিছু তাকায় না, সামনে চলতে থাকে। ঘন কুয়াশায় ঝাপসা সন্ধ্যে, মাঝে মাঝে একদম পরিষ্কার সবকিছু, তখনো সূর্য ডুবে যায়নি পুরোপুরি। সামনে চলতে চলতে হারুর পথ আগলে দাড়ায় একটি অপরিচিত লোক, লোকটির হাত বাড়িয়ে দেয় করমর্দন করার উদ্দেশ্যে, হারুর শরীরের অবস্থা আর মনের পরিস্থিতি জানতে চায়, হারু কিছু বলে না, বলতে পারে না, লোকটা হারুকে একটা পুরস্কার দিতে চায় এবং অনেক অনেক ধন্যবাদ জানায়। হারু কিছু না বুঝেই করমর্দন করে এবং মৃদু মাথা নাড়ায় আর এই সব করতে করতে সেই শাড়ি পরা মেয়েটি কপালে কালো টিপ নিয়ে, ঘাড়ের ঝোলা ব্যাগটা থেকে খইলশা মাছ দুটি বের করে দু হাতে নিয়ে সেই লোকটার পিছনে দাড়ায় এবং হারুকে ধন্যবাদ দিয়ে মেয়েটি বলে খইলশা মাছ দুটো তার অনেক পছন্দ হয়েছে ! আর এমন বৃষ্টির দিনে জল ঘোলা করে খইলশা মাছ ধরে দেবার জন্য হারুকে আন্তরিক অভিনন্দন। আরও বলে এই খইলশা মাছ দুটি আমাকে তুমি না দিলে এই মানুষটিকে হয়তো আমি আর পেতাম না, আমার ভালোবাসা ফিরে পেতে সাহায্য করায় তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। হারুর সংবেদ ফিরে এলে নীরবে মাথা নত করে সেই স্থান ত্যাগ করে; কিন্তু স্থান ত্যাগের পূর্বেই পথ আগলে দাঁড়ায় মর্জিনা। কিছু বুঝে উঠার আগেই মর্জিনা হারুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে গভীর কুয়াশার দিকে, সেই দিকটা ঘন অন্ধকার আর অপেক্ষাকৃত বেশী ঝাপসা; হারুকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই টেনে টেনে নিয়ে যায় একটা ছোট আড্ডায়। হারু ভালো করে তাকিয়ে দেখে পাঁচ/ ছয় জন মানুষ রয়েছে, এদের মধ্যে নর ও নারী উভয়ই অবস্থিত। হারু কাঁচুমাচু করে একটা খালি টুলে বসে পরে, কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা কিছুটা ধাতস্থ হতে না হতেই মর্জিনা হারুকে পরিচয় করিয়ে দেয় মজিদের সাথে। মজিদ মর্জিনাকে ভালোবাসে আর মর্জিনাও মজিদকে লাইক করে। আর এই সকল লাইক এবং ভালোবাসার গল্প হারু মর্জিনার মুখে শুনতে পায় অনেক দিন পরে, যখন মর্জিনা হারুকে ছেড়ে চলে যায়। তবে বিষয়টা এমন নয় যে মর্জিনা হারুকে ছেড়ে মজিদের কাছে চলে যায় বরং গল্পটা এমন যে, মর্জিনা মজিদকে সাথে রেখেই হারুর কাছে আসে আবার বছর দুয়েক পরে হারুর সাথে আর থাকে না মজিদের কাছেই থাকে, এই সকল আসা যাওয়া, থাকা থাকির মাঝে মজিদ ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে হারুর দিকে হাত বাড়ায় করমর্দন করার জন্যে; মজিদ হারুর সাথে করমর্দন করে, করতেই থাকে, হাত আর ছাড়ে না; হারু অস্বস্তি নিয়ে আরও কয়েকবার হাত ঝাঁকায়। অতঃপর মর্জিনা হারুকে টেনে নিয়ে যায় একটু দূরে ঘন কুয়াশায় এবং মজিদের সাথে কুশল বিনিময় না করার অপরাধে হারুকে অসামাজিক বলে গালাগাল দিতে থাকে এবং হারুকে আবার সেই আড্ডায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। হারু ফিরে এসে সেই খালি আসনে আগের মতো চুপচাপ বসে থাকে। মর্জিনা মজিদের হাত ধরে হাসতে থাকে আর বিভিন্ন জনের সাথে গল্প করতে থাকে। মর্জিনার এই হাসিতে যেন কুয়াশা আরও ঘন হতে থাকে এবং ততক্ষণে চোখে আর কিছু দেখা যায় না, হারু বসা থেকে উঠে দাড়ায় এবং সেই বৃষ্টির দিনে খইলশা মাছ ধরার স্মৃতি চারণ করতে থাকে, স্মৃতিতে আসে মর্জিনা, আরেকবার মনে পরে যায় এমন কোন এক রাতে চারিদিক আলোকিত করে শোফালী চলে যায় গঞ্জের চাল ব্যবসায়ীর বাড়িতে, মনে পরে যায় কুয়াশায় সোফিয়ার সাথে রাম সাগরে হেটে চলার কথা; ইহা একটি দিঘি, পূর্ণিমা আর কুয়াশায় এই দিঘি সাগরে রূপ নেয় কিংবা রাম মনের দুঃখে সাগরে ডুবে মরতে না পেরে এই দিঘির জলে এমন একটা পূর্ণিমা রাতে ঝাপ দিলে এই দিঘির নাম করন হয়, রাম সাগর; হয়তো বা রাম সাগর মানে রামের সাগর। স্মৃতি আর চিন্তার সাথে চলতে থাকে পথ চলা এবং এই কুয়াশার পাল বেধ করে মাঠের শেষ পর্যন্ত যাওয়া যেখানে ঈশ্বর অপেক্ষায় আছে হারুর আর হারু অপেক্ষায় আছে তার প্রশ্নের উত্তরের, মুখোমুখি বসা ঈশ্বরের।

এইভাবে রাত হতে থাকে এবং সেইসাথে কুয়াশা দখল করতে থাকে পুরা অঞ্চল আর বিশাল ঘাসের মাঠ। আকাশের দিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গেলে দেখা যায় পূর্ণিমার চাঁদ। আজ রাশ পূর্ণিমা। পৃথিবীর আকর্ষণে এই যে ভেসে যাওয়া কুয়াশা বাধা পরে যায় পৃথিবীর তলে, আর বিশাল মাঠে তা দেখে মনে হয় মাঠের উপরে একটা কুয়াশার স্তর, হাঁটু সমান উচ্চতায়; পৃথিবীর এতো আকর্ষণ কই যে পুরো কুয়াশার পালকে ধারণ করবে, ধরে রাখবে! তাই সবুজ মাঠের উপরে এক হাঁটু উচ্চতায় একটা কুয়াশার স্তর পরে থাকে এবং সেই কুয়াশায় পূর্ণিমার আলো পরলে সেইটা রুপালী হয়ে উঠে; ফলে আর সবুজ মাঠ সবুজ থাকে না হয়ে যায় রুপালী সাগর কিংবা রামসাগর। সেই হাঁটু সমান কুয়াশা ঠেলে ঈশ্বরের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত হারু, সামনের দিকে হাঁটা দেয়, হাটতে থাকে, আরও হাটে; শরীরের সকল শক্তি আর বুকে সোফিয়াকে নিয়ে হাঁটে আর হাঁটে, হেটে হেটে মাঠ পার হয়, মাঠ পার হতে হতে দেখতে পায় নৌকায় করে ধীরে ধীরে হারুর দিকে আসতে থাকে এক নারী! কাছাকাছি আসলে দেখা যায় সেই মেয়ের চোখ কান্নার জলে কিংবা কুয়াশার জলে, চোখের কাজলের সাথে মিশে এবং চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে চিক চিক করে উঠে,মেয়েটার আরও কাছাকাছি গেলেও হারু আর খেয়াল করে তার রেশমি চুল খোলা বাতাসে মৃদু উড়তে থাকে কিনা। রামসাগরে নৌকা চালায় সোফিয়া, হারুর মুখে কথা কয় না, সোফিয়া খেয়াল করে নাই হারুর চোখও কি পূর্ণিমার আলোয় চিক চিক করছিল কি না! শুধু হারুর হাতে ধরে বসিয়ে দেয় নৌকায় আর সেই নৌকা চলতে থাকে সারা রামসাগরের বুকে।

 

২৩.১১.২০১৩
১৩ তালা, রিংরোড/ শ্যামলী

 

12345
Total votes: 662

মন্তব্য