slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

একজন বিদ্রোহী মিতার আত্মহননঃ দায়ী কে?

নারীর উপর পুরুষের অত্যাচার-নির্যাতন, নির্বিচার শোষণ চালানো, নারী-পুরুষের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখা এবং নারীকে যৌনদাসী হিসেবে তার পাশে বেঁধে রাখার জন্য পুরুষতন্ত্রের একটি মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে একবিবাহ প্রথা। এটা নর-নারীর মাঝে এমন একটি সামাজিক চুক্তি যেখানে নারীকে আদেশ দেওয়া হয় পতিব্রতা(এখানে পতি শব্দটি অশ্লীল অর্থে ব্যাবহৃত) হতে, পুরুষের সকল কর্মকান্ডকে মুখ বুঝে মেনে নিতে এবং পুরুষটিকে দান করা হয় নারীর শরীরটিকে যখন-তখন যথেচ্ছ ভোগের স্বাধীনতা, নারীর মনের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য, শারিরীক-মানসিক নির্যাতন চালানোর সর্বোপরি ক্ষমতা এবং পাশা-পাশি অন্যান্য নারী-শরীর অবাধ সম্ভোগের অধিকার। পুরুষতন্ত্র তাদের এই ধরনের বৈষম্যমূলক চুক্তিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য উৎপত্তিকালীন সময় হতেই ভাষাকেও একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করে আসছে। এজন্য সে ভাষার মধ্যে তৈরী করে নিয়েছে শত শত নার-নারীর বৈষম্যমূলক ও কুৎসিত শব্দ এবং নর-নারীর মধ্যকার সামাজিক চুক্তি সংক্রান্ত সম্পর্ক বোঝাতে কিছু সাধারণ শব্দের অশ্লীল ব্যাবহার নিশ্চিত করেছে। এরকম কয়েকটি সাধারণ শব্দের মধ্যে দুটি শব্দ হল স্বামী এবং পতি। এই শব্দ দুটির মূলগত সাধারণ অর্থ হচ্ছেঃ মালিক, প্রতিপালক বা পরিচালক। স্বামী এবং পতি শব্দদুটি যখন কারো বিশেষণ রুপে ব্যাবহৃত হয় তখন অন্যকিছু বা অন্যরা তাদের মালিকানাধীন বা ব্রতী হয়ে পড়ে। আমাদের ভাষায় অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই শব্দদুটির বহুল ব্যাবহার লক্ষ্য করা যায় যেমনঃ ভূস্বামী- ভূমির মালিক বোঝাতে, সেনাপতি- সেনাদের পরিচালক বোঝাতে, এধরনের আরো নানা শব্দবন্ধ আমাদের ভাষায় প্রচলিত আছে। ধরে নিলাম পুঁজিবাদী সমাজে কোন একজন মানুষ ধন-সম্পত্তি, ভূমি, বাড়ি-গাড়ি, কল-কারখানা, কোন জড়বস্তু বা পশু-পাখির ব্যাক্তিগত মালিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে এবং যে কোন ধরনের সমাজে সহজেই একটি সংগঠনের পরিচালকের পদে অধিষ্ঠিত হতে পারে কোন যোগ্য ব্যাক্তি। কিন্তু ব্যাক্তিগত বিষয়, শারিরীক সম্পর্ক, চিন্তা-ভাবনা বা অনুভূতির ক্ষেত্রে একজন মানুষ তো কখনও আরেকজন মানুষের শরীর ও মনের মালিক, প্রতিপালক বা পরিচালক হতে পারেনা- এরকম হতে পারাটা নিশ্চিতভাবেই আমাদের মানবিকতার নূন্যতম স্তরকে খুব স্বাচ্ছন্দেই অতিক্রম করে যায়- যা সাধারণ নৈতিকতারও ঘোর বিরোধী এবং মানুষের ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে চরমভাবে পদদলিত করে যায় অনায়াসে।
টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাবিনা ইয়াসমিন মিতা মারা গেছেন। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বের হয়ে এসেছে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তার শরীরে নির্যাতনের কিছু কিছু চিহ্ন পাওয়া গেছে। বলা হচ্ছে- এই শারীরিক নির্যাতনের প্রত্যক্ষ কারনে তিনি হয়তো মারা যাননি, তিনি আত্মহত্যাই করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন তিনি আত্মহত্যা করতে গেলেন?
মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই তার জীবনকে প্রচন্ড পরিমাণে ভালোবাসে, যেকোন পরিস্থিতিতে সে তার একমাত্র জীবনটিকে যাপন করতে চায়। নানা ধরনের দুঃখ, কষ্ট, নির্যাতন সহ্য করেও কঠিন সংগ্রাম- সকল বাঁধা-বিপত্তি, প্রতিবন্ধকতার মধ্যদিয়ে সে তার জীবনটিকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে বেড়ায়, কোন কিছুর বিনিময়েই সে তার একমাত্র জীবনটিকে হারাতে রাজী নয়- কেবলমাত্র মানুষকে তার মহৎ আদর্শ, দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি বৃহত্তর ভালোবাসার কারনে জীবন বাজী রাখতে বা আত্মহুতি দিতে দেখা যায়। সাভারের রানাপ্লাজায় ধংশস্তুপের মধ্যে আটকে পড়া মানুষদের দিকে তাকিয়ে আমরা বুঝতে পেরেছি জীবনের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কত তীব্র ও আবেগময় হতে পারে, তাদের চোখ-মুখ হতে বাঁচার আকুতি তীব্র চিৎকার হয়ে আমাদের মনে, হৃদপিন্ডে এমন তীব্রভাবে আঘাত করতো যে তা দামামার মত বেজে উঠত। ধংশস্তুপের ভেতরে আটকে পড়া মানুষজনদের হাহাকার করে উঠা কণ্ঠস্বরে বলতে শুনেছি- আমার হাত-পা কেটে হলেও আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যান, আমি বাঁচতে চাই। অমানবিক দারিদ্র্যের মধ্যে সম্পূর্ণ সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সারা জীবন পঙ্গুত্বের অভিশাপ বহন করেও তারা বাঁচতে চেয়েছে। আর অভিনেত্রী সাবিনা ইয়াসমিন মিতা যার আছে খ্যাতি, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি, অভাব নেই টাকা-পয়সার, বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে আছে- একজন নারী হিসেবে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত দুটি সন্তান- এমন একজন ব্যাক্তি সামান্য দাম্পত্য কলহের কারনে নিজেই নিজের জীবন অবসান ঘটাবেন- এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কোন বক্তব্য হতে পারে? মোটেই না। অভিনেত্রী সাবিনা ইয়াসমিন মিতা অত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন, তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে(তার মৃত্যু যদি আত্মহত্যার কারনে ঘটে থাকে)।

এখানে আমার একটা মতামত জানিয়ে রাখি- খুন করার চেয়ে আত্মহত্যায় বাধ্য করাকে আমার নিকট অনেক বেশী গর্হিত অপরাধ বলে মনে হয়। হত্যাকান্ডের ঘটনায় হত্যাকারী ব্যাক্তি নিজ হাতে বা কারো মাধ্যমে তার শিকারকে খুন করে আর আত্মহত্যার বাধ্যকারী ব্যাক্তি তার শিকারের উপর এমন পৈশাচিক ভাবে শারিরীক-মানসিক নির্যাতন চালায় যে শিকার ব্যাক্তিটির কাছে মৃত্যুকেই মনে হয় তার উপর যাবতীয় নির্যাতনের উপশমকারী বলে। আমার মতে যে দেশে খুন করার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা নির্বাসন সেখানে আত্মহত্যায় বাধ্যকারী ব্যাক্তির একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদন্ড। পাঠক আমার এই বক্তব্যকে খোলা মন নিয়ে বিবেচনা করে দেখবেন, আশা করি।

অভিনেত্রী সাবিনা ইয়াসমিন মিতা আমাদের সকলের কাছে মিতা নূর নামেই পরিচিত। মিতা নূর নামের নূর অংশটা এসেছে শাহানূর থেকে। পুরুষতন্ত্রের একবিবাহ প্রথার শর্ত মেনে তিনি বৈবাহিক চুক্তিতে আবদ্ধ শাহানূরের নামের একটি অংশকে নিজের নামের সাথে জড়িত করেছেন। বিবাহ নামক সামাজিক চুক্তিটির প্রায় সকল শর্তাবলী নির্দ্ধিধায় মেনে নিয়ে শাহানূরের সাথে দীর্ঘ চব্বিশটি বছর সংসার করেছেন। পতিব্রতা(এখানে পতি শব্দটি অশ্লীল অর্থে ব্যাবহৃত) থেকেছেন, তার দেহের উপর দিয়েছেন শাহানূরের যথেচ্ছ ভোগের অধিকার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে উপহার দিয়েছেন দুইটি উত্তারাধিকার, নিজে টাকা-পয়সা উপার্জন করে স্বামী(এখানে স্বামী শব্দটি অশ্লীল অর্থে ব্যাবহৃত) সন্তানের ভরণ-পোষণ করেছেন, ঘর-সংসারের প্রায় সকল কাজ করেছেন নিজ হাতে(আমাদের সমাজের প্রত্যেকটি নারীকেই ঘর-গৃহস্থালীর সকল কাজ সামলাতে হয়-নারীটি উপার্জনক্ষম হলেও)। শুধুমাত্র একটি বিষয়ের বিরোধীতা করার কারনে তাকে খুন হতে হল, তাও আবার নিজের হাতেই; নিজেই ঘটাতে বাধ্য হয়েছেন নিজের জীবনের অবসান। কি ছিল তার সেই বিরোধীতার বিষয়, কিসের বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ করে বসেছিলেন যার জন্য তাকে জীবন দিতে হল। মিতা বিদ্রোহ করেছিলেন একবিবাহ প্রথার সেই শর্তের বিরুদ্ধে যেখানে পুরুষটির থাকবে অন্যান্য নারী-শরীরকে অবাধ ভোগের অধিকার। আমাদের সমাজের অধিকাংশ নারীই একবিবাহ প্রথার চুক্তিতে আবদ্ধ পুরুষটির অন্যান্য নারী-শরীরকে অবাধ ভোগের অধিকারকে অবলীলায় মেনে নেয়, মুখ বুঝে সহ্য করে নেয় সবকিছু কারন তারা জানে বিদ্রোহ করলেই তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে সন্তান-সংসার থেকে, সমাজে জুটবে তাদের কলঙ্ক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার খুব নড়বড়ে জায়গাটুকুও যাবে হারিয়ে, বেঁচে থাকার অধিকার টুকু নেয়া হবে কেড়ে। কিন্তু অভিনেত্রী মিতা ছিলেন শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা, সাবলম্বী, স্বাধীনচেতা, ছোটবেলা থেকেই একটু জেদী প্রকৃতির এবং সর্বোপরি একজন শিল্পী। ফলে তিনি শাহনূরের অন্যান্য নারী-শরীর অবাধ ভোগের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, সাহস পেয়েছিলেন একবিবাহ প্রথার এই শর্তটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে প্রজ্জ্বলিত হবার। কিন্তু পুরুষতন্ত্রের পেশীশক্তির কাছে তাকে পরাজিত হতে হয়েছে, নিজেই নিজেকে হত্যা করার মধ্যদিয়ে ঘটেছে তার নির্মম পরাজয়।

বিদ্রোহ করার সাথে সাথে তার উপর নেমে আসে নির্যাতন- শারিরীক, মানসিক দুই ধরনের নির্যাতন। শাহানূর কর্তৃক অন্যান্য নারী-শরীর অবাধ সম্ভোগের মাঝে মিতা কাটা হয়ে দাঁড়ালে সে তা সহ্য করতে পারেনি। বছরের পর বছর ধরে মিতার উপর চলতে থাকে নানা ধরনের অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতন চলাকালীন সময়গুলোতে তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউই সহমর্মী, সমব্যাথী হয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় নি। এমনকি যে মিডিয়াগুলো বাজারে তাদের কাটতি বাড়ানোর জন্য জনপ্রিয় অভিনেতা- অভিনেত্রীদের খুব সামান্য ঘটনাও ঢালাও করে প্রচার করে থাকে সেই মিডিয়াগুলোকেও মিতার উপর শাহানূরের নির্যাতনের ব্যাপারে তাদের টু শব্দটিও করতে দেখা যায়নি- বোধ হয় পুরুষতান্ত্রিকতার কারনেই। বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের কারনে মিতা ধীরে ধীরে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন, আক্রান্ত হন বিষন্নতায়। সকল কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন নিজেকে, মেজাজ খিটিখিটে হয়ে যায়, অল্পতেই রেগে যেতে থাকেন; ঘুমের ঔষধ সেবন না করে ঘুমাতে যেতে পারতেন না। এর পূর্বেও কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেও ব্যার্থ হয়েছেন। তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা এ সমস্ত বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত হওয়ার পরও তাকে মনঃচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। দরকার মনে করেনি গৃহ নামক সেই কারাগার থেকে থেকে তাকে বের করে নিয়ে আসার যেখানে থেকে তিনি অমানুষিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত- শ্যুটিং থেকে ফিরতে সামান্য দেরী হলেই তার উপর নিপতিত হত অশ্রাব্য কটু ভাষার ধারাবর্ষণ। মৃত্যুর দুইদিন আগে নির্যাতনে অসহ্য হয়ে নিজে ফোন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনকে নিয়ে আসলে তারা তাকে সামাজিক প্রথা-সংস্কারের দোহাই দিয়ে উল্টো-পাল্টা বুঝিয়ে সেই নির্যাতন কক্ষেই আবার ফেরত পাঠায়( আমাদের সমাজের একজন নারী তার উপরে নির্যাতনের মাত্রা কি পরিমাণ ভয়াবহ হয়ে উঠলে স্বামী পরিচয় দানকারী ব্যাক্তির বিরুদ্ধে পুলিশ ডেকে পাঠায়!)। এখানে পুলিশের ভাষ্য হচ্ছে মিতা যেহেতু একজন পরিচিত মুখ তাই বিষয়টিকে গোপন রাখা হয়।

এখন পর্যন্ত যেহেতু মিতার মৃত্যু ঘটনার প্রকৃত সত্য পুঙ্খানুপুঙ্খ উন্মোচিত হয়নি সুতরাং যুক্তিসঙ্গত অনুমানই আমাদের একমাত্র আশ্রয়। সকলে একটু ভেবে দেখুন, যে লোক তার মদের আড্ডা থেকে ফিরে স্ত্রীর উপর নিয়মিত নির্যাতন চালায় সেই স্ত্রী যদি তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে তাহলে ঐদিন দিবাগত রাত্রে তার স্ত্রীর উপর লোকটি কি পরিমাণ নির্যাতন চালাতে পারে এবং এরপর থেকে নির্যাতনের ভয়াবহতা কিরকম ভাবে বেড়ে যেতে পারে- এর প্রমাণ আমরা পেলাম এর ঠিক দুই দিন পরে, মিতার আত্মহত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে। যারা বিষয়গুলো সমন্ধে অভিহিত ছিল তারা সকলে না জানার ভান করে নীরব থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছে। ভাবটা যেন এমন নারীর আবার জীবন! বেঁচে থাকলেই কি আর না থাকলেই কি। নারীর কি অভাব পড়েছে বাংলাদেশে! মিতার উপর শাহানূরের নির্যাতনকে তাদের নিজেদের পারিবারিক, ব্যাক্তিগত ব্যাপার বলে সকলে এড়িয়ে গেছেন। পুরুষতান্ত্রিকতা অবশ্য আমাদের তাই শেখায়- একবিবাহ প্রথায় চুক্তিবদ্ধ পুরুষটি যদি নারীটিকে সকলের সামনেই অকথ্য নির্যাতন চালায় তাহলে সেটাকে তাদের ব্যাক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় সমাজ থেকে। শাহনূরের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বিদ্রোহী মিতা একপর্যায়ে শাহনূরের সাথে করা বিয়ে নামক সামাজিক চুক্তিটির অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি হয়ে তার বড় ছেলে মাঝখানে এসে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যাকে মিতা দশটি মাস তার নিজ গর্ভে ধারণ করেছেন, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর বুকের দুধ খাইয়েছেন, স্নেহে, মমতায়, ভালোবাসায় বড় করে তুলেছেন। ছেলেটির বয়স খুব বেশী না হলেও এর মাঝেই তার মধ্যে ঢুকে গেছে পুরুষতন্ত্রের বীজ। সে জানে একবিবাহ চুক্তিতে আবদ্ধ পুরুষটির আছে অন্যান্য নারী শরীর অবাধ ভোগের অধিকার, আর এর বিরুদ্ধের সামান্য বিরোধীতা করার অধিকারও নারীটির নেই। যাদের গর্ভে ধারন করেছেন তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে, তাদের কথা রাখতে গিয়ে তার গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে একান্ত বাধ্য হয়ে পিছু হটে এসেছেন। ঐ সময় মিতা যদি শাহানূরকে ত্যাগ করে চলে আসতে পারত তাহলে আজকে তাকে হয়তো আত্মহত্যার মত মর্মান্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হত না। আমরাও হারাতাম না আমাদের সকলের প্রিয় সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছল এই বিদ্রোহী শিল্পীকে।

আরেকটি বিষয় হল- যেদিন মিতা তার জীবন থেকে শাহানূরকে ত্যাগ করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেদিন থেকে তার প্রতি আর কোন ভালোবাসা তো ছিলই না বরঞ্চ মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন। অথচ তারপরও বিয়ে নামক সামাজিক চুক্তির শৃংখলে আবদ্ধ থাকতে হয়েছে ঘৃণিত শাহনূরের সাথে। যা নারীর জন্য খুবই মর্মান্তিক একটি বিষয়। শাহানূরের প্রতি যদি ঘৃণা না থাকত তাহলে নিশ্চয় তাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতেন না। পাঠক একবার ভেবে দেখুন, নারী-পুরুষ দুই ধরনের পাঠকই একবার গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন মিতাকে প্রত্যেকরাত্রে এমন একজনের সাথে ঘুমাতে যেতে হচ্ছে যে লোক তার উপর শারিরীক-মানসিক নির্যাতন চালায় এবং একারনেই যে লোকটিকে মিতা মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন। এবং এরপর থেকে যে কয় বার তাদের শারিরীক মিলন হয়েছে আমরা ধরে নিতে পারি তত বারই মিতা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন(নির্যাতক এবং যাকে সে ঘৃণা করে এমন ব্যাক্তির সাথে শারিরীক মিলনে অনিচ্ছা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক)। আমরা সকলেই জানি যে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী ধর্ষণকে নীরব ধর্ষণ নামে অভিহিত করা হয়। পুরুষতান্ত্রিক যথোপযুক্ত শিক্ষার কারনে এধরনের ধর্ষণের ব্যাপারে আমরা সকলে সবসময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে থাকি। শারিরীক-মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি এই নীরব ধর্ষণও তাকে আরো বেশী করে বিষন্নতার দিকে ঢেলে দিয়েছে বলে মনে করাটা নিশ্চয় বোকামী হবে না।

সাবিনা ইয়াসমিন মিতা একজন শিল্পী ছিলেন। তার হাসির ছটায়, দেহ ভঙ্গীমায়, চোখের কটাক্ষে, মুখের সুন্দর ভাষায় এবং সাবলীল অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শিল্প সৃষ্টি করতেন। আমাদেরকে শিল্পের আস্বাদ দিতেন, আনন্দের ভাসিয়ে রাখতেন। নিজে যেমন সৌন্দর্য সৃষ্টি করতেন তেমনি ভালোবাসতেন সুন্দরকেও। বাসার ছাদে তৈরী করেছিলেন বিশালাকারের একটি বাগান- শোবার ঘর সাজিয়েছিলেন নানা ধরনের অকৃত্রিম লতাগুল্ম দিয়ে। শাহানূর কর্তৃক তার উপর নির্যাতন শুরু হওয়ার পর থেকে তার মাঝের এই শিল্পীসত্ত্বা উবে যেতে থাকে- বাগানের প্রতি তার পূর্বেকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন, শুধু অলসভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বাগানে বসে থাকতেন, যে অভিনয় তার পুরো জীবনের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল সেই অভিনয় থেকেও নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। মনে-প্রানে একজন শিল্পী যদি তার শিল্পী সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলেন তাহলে তার আর কি অবশিষ্ট থাকে? বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে ছিল তার দুটি ছেলে, দেখলেন পুরুষতন্ত্রের জোয়াল ইতিমধ্যেই তাদের কাঁধে চেপে বসেছে। তার এই সংগ্রামে-বিদ্রোহে তাদেরকেই কাছে পাবার আশা করেছিলেন, কিন্তু পাননি- পেলে হয়তো তাকে এভাবে মৃত্যুবরণ করতে হত না। তার বেঁচে থাকার সকল রাস্তা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এসেছিল। খোলা ছিল একমাত্র মৃত্যুর দুয়ার। শাহানূর পিছন থেকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে সে দিকেই ধাবিত করেছে ক্রমান্বয়ে। কারন তার অবাধ নারী-শরীর সম্ভোগে মিতাই একমাত্র বাঁধা। মিতার এই দুঃসময়ে কোন বন্ধু এসে তাকে হাত ধরে মৃত্যুর গহ্বর থেকে তার মুখ ঘুরিয়ে জীবনের আকাশের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় নি। বিদ্রোহী মিতা বাধ্য হয়েছেন চরম নিঃসঙ্গ অবস্থায় একা একা মৃত্যুর সদর দরজা পেরিয়ে যেতে।

তার এই মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? শুধু মিতা নয়- এরকম হাজার হাজার বিদ্রোহী নারী মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন প্রতিনয়ত। আর যারা বিদ্রোহ করেনা, মুখবুঝে সহ্য করে সবকিছু, তারাও কি রেহাই পেয়ে যায় নাকি মাঝে মাঝে তাদেরও ভয়াবহ পরিণতি বরণ করে নিতে হয়! কে দায়ী? এই দায় আমাদের সকলের। এই সমাজে জন্মগ্রহণ করার ফলে পুরুষতান্ত্রিকতা কম-বেশী আমাদের সকলের মধ্যেই আছে। বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, সমাজ বিষয়ক পাঠ, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের কিছু পড়াশুনা, প্রগতিশীল নানা ধরনের সংগঠনের সাথে নিজেদেরকে জড়িত করা, মুক্তভাবে চিন্তা করা ও স্বাধীনভাবে লেখা-লেখি করার ফলে আমাদের মাঝের পুরুষতান্ত্রিকতা হয়ত কিছুটা পরিশীলিত হয়েছে- কিন্তু একেবারে নির্মূল হয়ে গিয়েছে বলে আমি মনে করতে পারিনা। আমি যে এই প্রবন্ধে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এত বড় বড় কথা বললাম; মাঝেই মাঝেই কাব্যচর্চা করি, গল্প লেখি, সামাজিক-রাজনৈতিক নানা বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লেখি, নিজেকে দাবী করি একজন প্রগতিশীল, মুক্তমনা, মানবিক, সহানুভূতিশীল এবং নারীবাদী হিসেবে কিন্তু এই আমিই যদি শাহানূরের জায়গায় থাকতাম তাহলেও কি মিতা পারতো এই পরিণতিকে এড়াতে? যেমনটি ঘটেছে ঠিক তেমনটাই হয়তো ঘটত- নিজেকে খুন করার অপরাধ তুলে নিতে হত নিজের কাঁধেই! আমরা এই সমাজের প্রত্যেকটি বাসিন্দা, মিতা সহ লক্ষ লক্ষ নারীর আততায়ী হিসেবে আবির্ভূত হই প্রতিনিয়ত। আমাদের প্রত্যেককে দাঁড়াতে হবে মুক্তমনের কাঠগড়ায়। নারীর প্রতি নিজেদের প্রত্যেকটি চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি, মনোভাব ও আচরণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে-খুঁজে বের করতে হবে নানা ছদ্মবেশে কি পরিমাণ পুরুষতান্ত্রিকতা আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে লুকায়িত আছে। তারপর সমাজের মধ্যকার নানা ধরনের নর-নারীর সামাজিক বৈষম্যমূলক প্রথা ও সংস্কার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে সচেতনভাবে ধীরে ধীরে নিজেদেরকে নিয়ে যেতে হবে শোধনের রাস্তায়।
আর মিতার আত্মহত্যায় যে প্রত্যক্ষ বাধ্যকারী শাহানূর; সেই ব্যাক্তি কি পার পেয়ে যাবে, তাকে কি দাড়াতে হবে না আদালতের কাঠগড়ায়, আমরা কি তার বিচারের দাবি উঠাবো না?

শাহানূর কাঠগড়ায় দাঁড়াবে তো দূরের কথা, মিতার আত্মহত্যার ভিতরের সত্যকে ধামা-চাপা দেওয়ার জন্য চলছে নানা ধরনের চক্রান্ত। মরে গিয়েও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছোবল থেকে রেহাই পায় না মিতারা। সহকর্মী শিল্পীদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর অবকাশ না দিয়েই তাড়াতাড়ি করে তার দাফনকার্য শেষ করে ফেলা হয়েছে। আত্মীয়-স্বজন এমনকি মা-বাবা পর্যন্ত মুখ খুলতে রাজী হচ্ছে না। মিতার পরিবার আর শাহানূরের পরিবার বিষয়টিকে নিজেদের মধ্যে ফায়সালা করে ফেলছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে যে যাবার সে তো চলেই গেছে- এখন হাঙ্গামা বাড়িয়ে মিতার সন্তান দুটির ভবিষ্যত নষ্ট করে কি লাভ! তাদের যুক্তির বাহার দেখে আশ্চর্য হতে হয়। যে লোকটি তাদের মাকে নির্যাতন করতে করতে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে এমন একজন পিতার সাথে বেড়ে উঠলে তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে! আর লোকটিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করালে নষ্ট হয়ে যাবে ছেলেদের ভবিষ্যত! অন্যায়কারী অনেকেই সন্তানের পিতা হতে পারে তাই বলে তাদের অপরাধ হালকা বা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না। উপরন্তু মিতার গর্ভের সন্তানকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে মিডিয়ার মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। অদ্ভূত এক সমাজে আমাদের বাস। যেখানে মেয়েদের বেঁচে থাকাই পাপ- মরে যাওয়ার পরও তাদের খুনীদের বিচার হয় না, মৃত্যুর প্রকৃত সত্যকে গোপন করার চেষ্টা করে তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনরা স্বয়ং।

এখানে যে গল্পটি বলা হল তা শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রী মিতার গল্প নয়, এরকম অসংখ্য বিদ্রোহী মিতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারনে তাদের প্রত্যেককেই বরণ করে নিতে হচ্ছে নানা ধরনের মর্মান্তিক পরিণতি। কিন্তু যেদিন সকল একক একক বিদ্রোহ একসাথ হয়ে অগ্নিকুন্ডের মত জ্বলে উঠবে সেদিন নারী-পুরুষের মধ্যকার ও অন্যান্য সকল ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্যকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেবে।

সূত্রঃ
জাতীয় দৈনিক ও চব্বিশ ঘন্টার অনলাইন পত্রিকাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদন।

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 478

মন্তব্য