slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

আজ সারাদিন

আমি মানুষটা ভীতু প্রকৃতির । বিপদ দেখলে দৌড়ে গর্তে লুকিয়ে পড়ব এটাই আমার স্বভাব । আমি কাউকে বিপদে ফেলি না , কারো  বিপদে সাহায্যও করি না । তবে  বিপদ থেকে কিভাবে নিজেকে বাঁচানো যায় , আমি সবসময় এই ভাবনায় মশগুল । কিন্তু বিপদ এমন এক বন্ধু যা বলে কয়ে আসে না । আর এসেই ব্যাটা সোজা ঘাড়ের উপর চড়ে বসে ।

আমার মত মানুষের দেশ নিয়ে কোন ভাবনা নেই । সরকারে কে এলো  আওয়ামীলীগ  না বিনপি , এই নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই । কারন আমার জানা আছে , যেই আসুক না কেন আমার অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না । আমি মিডিল ক্লাস সারাজীবন মিডিল ক্লাসই থেকে যাব বাজারের জিনিসপত্রের দাম যখন চড়া হয় তখন সরকারকে অকথ্য ভাষায় একটা গালি দেব আমার দৌড় এই পর্যন্তই । আমার মত সাধারন মানুষ মরলে লোকমুখে একটু আফসোস ছাড়া আর কিছু পাব বলে মনে হয় না । 

আমি একটা ব্যাংকের ক্যাশিয়ার পদে চাকরি করছি আজ প্রায় দশ বছর হল আমাকে প্রতিদিন আট ঘণ্টা অফিস করতে হয় । তিন ঘণ্টা বাসে চেপে  জ্যামে পড়ে আর প্রচণ্ড গরমে ঘেমে আমাকে ডেইলি অফিসে যেতে হয় । একটা মজার ব্যাপার বলি । ক্যাশিয়ার হিসেবে আমার হাত প্রতিদিন প্রায় কয়েক লাখ টাকার আদান-প্রদান হয়অথচ মাসের শেষ না হতেই আমার হাতে টাকা ফুরিয়ে যায় । ধারের জন্য তখন আমি ছুটে বেড়ায় অফিসের এ মাথা থেকে ও মাথা । সেই সময় আমার অফিসের কলিগেরা আমার উপর চরম বিরক্তি প্রকাশ করে । কেউ কেউ আছেন আমার দিকে এমন ভাবে  রাগ চোখে তাকিয়ে থাকেন যেন হাতে বন্দুক এনে দিলে আমাকে এই মুহূর্তে গুলি করে হত্যা করবেন ।  কারো কাছে টাকা চাওয়ার একটা সুবিধা আছে । আপনি সহজেই চিনতে পারবেন । কে আপনার প্রকৃত বন্ধু আর কে দুধের মাছি ।

এখন সকাল সাতটা বাজে । বাসা থেকে বের হতে হবে । কেননা বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে । সময় আমাকে আর অনুমতি দিচ্ছে না বাসায় থাকার জন্য । আমার আট বছরের একটা মেয়ে আছে । বাবলি । ওকে প্রতিদিন স্কুলে দিয়ে তারপর আমার অফিসে যেতে হয় । বাবলি এখনও ঘুম থেকে উঠেনি । মশারিটা উঠিয়ে ওর  গায়ে হাত দিয়ে আঁতকে উঠলাম । দেখি ওর গায়ে প্রচণ্ড জ্বর । মেয়েটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে । মেয়েটা হু হু করে কাঁপছে । আমি সায়মাকে ডাক দিলাম । সায়মা আমার স্ত্রী । সায়মা এসেই অবাক হল । হঠাৎ মেয়েটার জ্বর আসলো কি করে ও মনে মনে বলে উঠল ।

টেলিভিশনে নাটকে বা সিনেমায় আপনারা প্রায়ই দেখে থাকবেন । মেয়ের জ্বর আসলে বাবা টেলিফোনটা উঁচিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসেন । আমার পক্ষে তো আর সেটা করা সম্ভব না । এদিকে অফিসেরও দেরি হয়ে যাচ্ছে । কি করব ভেবে পাচ্ছি না । পকেট থেকে পাঁচশ টাকা বের করে সায়মার হাতে দিয়ে বললাম , ওকে ওষুধ আর কিছু ফলমূল কিনে খাইয়ে দিও । মন চাচ্ছে না মেয়েকে এই অবস্থায় রেখে অফিসে যেতে ছোটবেলায় স্কুল কামাই দিয়েছে অনেক কিন্তু এখন অফিস যে কামাই দেব তার কোন সুযোগ নেই ।

রাস্তায় বেড়িয়ে যে জিনিসটা আমার সবচেয়ে বিরক্তি লাগে তা হল মানুষের ঢল । এত মানুষ কাজের জন্য ছুটছে । দেখেই নিজেকে সৈনিক সৈনিক মনে হয় । যেন আমরা সবাই  যুদ্ধে যাচ্ছি । বাঁচার জন্য যুদ্ধ । বাসে এত মানুষের ভিড় । হাত পা খুলে একটু দাঁড়াবেন সেই জায়গাটুকুও নেই । এদিকে বাসের হেল্পার একের পর এক মানুষ তুলছে বাসের ভিতরে ভিতরে দাঁড়াবার জায়গা আছে কিনা সেটাও দেখছে না । বাসের হেল্পাররা খুব রুক্ষ প্রকৃতির মানুষ হয় । তাদের বিরুদ্ধে  কিছু বলতে গেলে আবার গালাগাল খেতে হয় । আমি ভয়ে কিছু বলি না । যা ভাড়া চায় তাই চুপচাপ দিয়ে দেই । 

অফিসে যাওয়ার পর বসের ডাক এলো । অফিসের বস  বেশ ভোজনরসিক মানুষ । বিভিন্ন ধরনের খাবার খেতে   তিনি বেশ পছন্দ করেন । আমি যখনই ওনার রুমে যাই , দেখি উনি কিছু না কিছু মুখে নিয়ে চিবুচ্ছেন । আমাকে দেখেই এক গাল হেসে জিজ্ঞেস করলেন , কি ব্যাপার ? এত দেরি কেন ?

আমি বললাম সেই পুরনো অজুহাতের কথা মানে ট্র্যাফিক জ্যামের কথা ।

উনি বিরক্তি হয়ে বললেন , আপনি আশেপাশে কোথাও বাসা নিতে পারেন না ?  

আমি উত্তর দিলাম , স্যার । গুলশানে যদি বাসা ভাড়া নিতে চাই তাহলে আমার পুরো মাসের মাইনেটাই বাসা ভাড়া হিসেবে দিতে হবে । তখন সারা মাস খাব কি ?

উনি হাসতে লাগলেন । জোরে জোরে হাসছেন । আশ্চর্য আমি বলছি দুঃখের কথা আর উনি হাসছেন । মানুষ ঠিকই বলে কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ ।

আমাদের দেশের মানুষকে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি আর একটি জিনিস শিক্ষা দেওয়া উচিত । সেটা হল ধৈর্যের শিক্ষা । মানুষজন একটু কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তুলবে সেই ধৈর্যটুকু মানুষের নেই । আমাকে মাঝে মাঝে গ্রাহকদের অপমান সইতে হয় । আমার হাসি মুখে সেই অপমান শুনা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না । কেননা গ্রাহকের সেবা নিশ্চিত করা এটাই আমাদের ব্যাংকের মূলনীতি ।

দুপুর হয়ে এলো । লাঞ্ছ আওয়ার চলছে । অফিসের সবাই বাসা থেকে কিছু না কিছু লাঞ্ছের জন্য নিয়ে আসে । আমার কখনই তা করা হয় না । বাইরে খেতে যাব তাও আবার গুলশানের মত এরিয়ায় । চোখের নিমিষেই পকেট থেকে দুই তিনশত টাকা খুইয়ে যাবে । ব্যাংকের বাইরে ছোট একটা চায়ের দোকান আছে । অল্প টাকার মধ্যে চা পানি বিস্কুট খেয়েই আমি দুপুরটা পার করি । বাসায় একটা ফোন করা দরকার । মেয়েটার জ্বর বাড়লো কি কমলো কে জানে ?

দুই বার ফোন করলাম। সায়মা ফোন রিসিভ করলো না । বোধহয় ও রাগ করেই ফোন ধরছে না । গত কয়েকমাস ধরেই  সায়মা আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে । প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া ও তেমন কোন কথাই বলে না । রাতের বেলা বিছানায় আমরা একজন আরেকজনের মুখ চেয়ে ঘুমাই না । বাইরের মানুষের কাছে এমন ভাব করি যেন আমরা সুখে আছি । দরিদ্রতা আর অভাবের অভিশাপ আমাদের ভালোবাসা কে শেষ করে দিয়েছে । অথচ সায়মাকে আমি অনেক ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম । অভাব যখন দরজায় আসে তখন ভালোবাসা  জানালা দিয়ে পালিয়ে যায় এই বাস্তব সত্য জেনেও আমি ভুল করলাম । কোথায় জানি পড়েছিলাম মানুষই নাকি একমাত্র প্রাণী যে একটা জিনিস ভুল জেনেও সেই ভুল জিনিসটা বার বার করে ।

সায়মা তখন ইন্টার পাশ করে একটা ডিগ্রী কলেজে পড়ছে । আর আমি সবেমাত্র এই ক্যাশিয়েরর চাকরিটা পেয়েছি । ওকে কাছে পাওয়ার নেশায় তখন আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম । প্রচণ্ড পাগলামি শুরু করলাম । সায়মারা তিন বোন । সায়মা হল সবচেয়ে ছোট । ওর বড় দুই বোনের তখনও বিয়ে হয়নি । আমার পাগলামির কারনে শেষপর্যন্ত ওর বাবা মা আমার সাথে ওর বিয়ে দিতে রাজি হয় । কিন্তু কয়েক বছর পার হতে না হতেই উনাদের বুঝতে বাকি রইল না যে আমি সায়মার স্বামী হিসেবে কতটুকু অযোগ্য । সায়মার বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে মোটামুটি টাকা পয়সাওয়ালা বড়লোকদের ঘরে । আর সায়মা আমার সাথে অভাবে ভুগে ভুগে জীবন কাটাচ্ছে ।  ও আমাকে মুখ ফুটে কোনদিন কিছু বলে না । কিন্তু আমি জানি ওর মনের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ । ও ভেবেছিল আমি হয়ত ওকে অনেক সুখে রাখব । কিন্তু সুখ তো সায়মা পেলই না । পেল শুধু দুঃখের সংসার

মানুষজনের স্বভাব এমন কেন ? কোথাও পার্টিতে গেলে  বা  বিয়ে বাড়িতে যেতে হলে দামি দামি পোশাক , গহনা , জুতা এগুলো পরে যেতে হবে । নইলে মান ইজ্জত থাকবে না । পোশাক আশাক দিয়েই কি মানুষের মর্যাদা বিচার করা যায় ?  আমার স্পষ্ট মনে আছে  একবার সায়মার এক আত্মীয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম । বাবলি মামুনি প্রায় সব নতুন ড্রেসই পড়ে পড়ে  নোংরা করে ফেলেছে । বিয়েতে যাওয়ার মত ভালো ড্রেস ছিল না ওর । এরপরও সায়মা একটা ভালো ড্রেস বেছে দিলো রোদেলাকে । আমার মেয়েটা সেই ড্রেসটা পড়েই হাসি মুখে আমাদের সঙ্গে বিয়ে বাড়িতে চলল । সায়মার বড় বোনেরা রোদেলার ড্রেস দেখেই চিৎকার করে সবার সামনে বলতে লাগলো ,

কি এমন লোকের সাথে বাস করিস যে মেয়েকে একটা ভালো ড্রেসও কিনে দিতে পারে না ?

এখানেই শেষ নয় । সায়মা সেদিন খালি গলায় কোন গহনা না পড়েই বিয়েতে গিয়েছিল । রোদেলার বড় বোনেরা সেটা নিয়ে কথা বলতেও বাকি রাখল না । সায়মাকে অনেকবার ওর বাবা মা বুঝিয়েছে আমাকে ছেড়ে দিয়ে নতুন করে সংসার করতে । সায়মা শুধু নীরবে চোখের জল ফেলেই গেছে , এই প্রস্তাবের কোন জবাব দেয় নি । আমি জানি ও আমাকে ছেড়ে যাবে না । তাই বলে ওকে আমি কষ্টের মধ্যে রাখব । সেটাও তো ঠিক না । অর্থ কষ্ট অনেক বড় ধরনের কষ্ট । আপনি যদি মনে খুব কষ্ট পেয়ে থাকেন একটা সময় পার হয়ে গেলে আপনি হয়ত সেই কষ্টটাকে ভুলে যাবেন । কিন্তু অর্থ কষ্ট কেবল অর্থ দিয়েই উপশম ।

ভালোবাসার মানে এক এক জনের  কাছে এক এক রকম । আমার কাছে ভালোবাসা  মানে হল ভালোবাসার মানুষটিকে ভালো রাখা । যেই কাজটা আমি কখনই করতে পারিনি । শুধু ভালোবাসলেই কি চলে ? আজকের দুনিয়ার শুধু ভালোবাসা  দিয়ে আর যাই হোক সংসার চলে না । এই তো কয়েকদিন আগের কথা মেয়েটার জন্মদিন ছিল । অনেকদিন ধরে বাবলি বায়না ধরেছে একটা হারমোনিয়ামের জন্য । কেঁদেকেটে একেবারে নাজেহাল অবস্থা । আমার আর কি করার ? সন্তানদের আবদারের কাছে বাবা-মা হার মানতে বাধ্য । ঠিক করলাম ওর জন্মদিনে ওকে একটা হারমোনিয়াম গিফট করব । কিন্তু শেষপর্যন্ত আমি আর পারলাম না । প্রাইভেট কোম্পানি । কোন কোন মাসে বেতন হয় সাত আট তারিখে , আবার কোন মাসে বিশ বাইশ তারিখে । মেয়েটার জন্মদিনে আমার বেতন হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু হল না । কারো কাছে টাকা ধার চেয়েও কোন লাভ হল না । আমি খালি হাতে বাসায় ফিরলাম । মেয়েটা নিরবে চোখের পানি ফেলল । নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল সেই সময় । আমার ছোট্ট মেয়েটা একটা বায়না ধরেছে , আমি সেটা রাখতে পারলাম না ।

মাঝে মাঝে নিজেকে দুনিয়ার সবচাইতে দুঃখী মানুষ মনে হয় অথচ বিয়ের আগে নিজেকে অনেক সুখী আর সৌভাগ্যবান ভাবতাম । অফিস শেষ করে বাসে চড়ে বসলাম । বাস থেকে নেমে বাকি পথটা আমি প্রতিদিন হেঁটেই যাই । আজকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে । তাই একটা রিকশা নিলাম । কিছু পথ না যেতেই একটা অ্যাকসিডেন্ট হল । রাস্তার পাশে একটা করোলা সাদা রঙের প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে ছিল । রিকশাওয়ালা লোকটা রাস্তার বাম পাশে বেশি চাপাতে গিয়েই গাড়িতে কয়েকটা আঁচড় পড়ল আর গাড়ির ডান পাশের লুকিং গ্লাসটা ভেঙ্গে গেল । গাড়ির মালিক ও উনার বন্ধুরা পাশেই চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল । রিকশাওয়ালা লোকটার ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে । কি করবে ভেবে পাচ্ছে না । হঠাৎ গাড়ির মালিক এসে রিকশাওয়ালা লোকটার গালে ঠাশ করে একটা চড় বসিয়ে দিল । উনার বন্ধুরা এসে শুরু করল অনবরত চড় কিল ঘুসি । মারতে মারতে  রিকশাওয়ালা লোকটাকে একেবারে রাস্তায় শুইয়ে দিল । বলতে লাগল ,

হারামজাদা । দেখে গাড়ি চালাতে পারিস না ?  দেখছিস কি করছিস ? ‘

রিকশাওয়ালা লোকটা রাস্তায় বসে বসে কাঁদছে । এই কান্না আমার চেনা । গরীব মানুষের কান্না , দুঃখী মানুষের কান্না , যেই কান্না চলে আসছে কয়েক হাজার বছর ধরে । এই কান্না যে আরও কয়েক হাজার বছর ধরে চলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই । আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছি । এই টাকাপয়সাওয়ালা লোকগুলোর কাছে আমি নিজেই অসহায় । এরপরও আমি মুখ ফুটে বললাম ,  

ভাই । গরীব মানুষ । ভুল হয়ে গেছে । মাফ করে দেন ।

লোকটি চেঁচিয়ে বলল , গরীব মানুষ তো কি হইছে ? দেখে চালাতে পারে না ।

আমি আর কিছুই বলার সাহস পাচ্ছিলাম  না । ততক্ষণে অনেক লোকজন  জড় হয়ে গিয়েছে । রিকশাওায়ালা লোকটি একেবারে নিশ্চুপ হয়ে বসে রয়েছে রাস্তার উপরে । নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । জীবনের নিষ্ঠুরতায় সে হতভম্ব । গাড়ির মালিক লোকটি এক আজব কাণ্ড করে বসলেন । রিকশাওয়ালা লোকটিকে বললেন ,

তুই জরিমানা দে । এখুনি । টাকা বাইর কর ।

আমি এই কথা শুনে অবাক হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম । যে লোক কিনা গাড়িতে চলাফেরা করে  তার কয়েক হাজার লুকিং গ্লাস কিনার সামর্থ্য আছে । তারপরও এই লোকটি কেন এই গরীব বেচারা রিকশাওয়ালার কাছে টাকা চাইছে । প্রথমদিকে হয়ত রাগের বশে এই রিকশাওায়ালা লোকটিকে মেরেছিল । কিন্তু তাওতো ঠিক না । মানুষ যত বড়ই অপরাধ করুক না আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাকে এভাবে নির্বিচারে , নির্দয় ভাবে রাস্তার উপর তার গায়ে হাত তুলা , তাকে জখম করা এটা বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর কোন দেশেই তার কোন বৈধতা নেই ।

 রিকশাওয়ালা লোকটিকে দেখে আমার খুব মায়া লাগল । আমার সাধারনত খুব সহজে কারো জন্য মায়া জন্মায় না । কিন্তু লোকটির জন্য আমার মত স্বার্থপর  মানুষের  মনে কোন জায়গা থেকে যে মায়া উদ্ভব হল বুঝলাম না । লোকটির দিকে চাইতেই বুঝলাম লোকটি হয়ত সে তার ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছে । তার ভাগ্য তাকে গরীব বানিয়েছে । তাই বড়লোকের শোষণ তাকে সইতেই হবে । কেননা গরীব মানে অর্থহীন , গরীব মানে ক্ষমতাহীন । ন্যায়বিচার তার জন্য দুস্পাপ্য । আমি চিৎকার করে বলতে চাইছিলাম ,

এই যে গাড়িওয়ালা ভাই । আপনি অন্যায় করছেন , গরিবের উপর জুলুম করছেন ।

কিন্তু সাহস হল না । আশেপাশে অনেক মানুষ জড় হয়েছে । কেউ কিছু বলছে না । দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে । আমি একা সেখানে কি করতে পারি । এরপরও গাড়িওয়ালা লোকটিকে  বললাম , 

ভাই । গরীব মানুষ । সারাদিনে আর কয় টাকা কামায় । এত টাকা কোথা থেকে দিবে ? আপনি একটু বুঝার চেষ্টা করুন ?

আমার কোথায় কোন কাজ হল বলে মনে হয় না । লোকটা একটানা অকথ্য ভাষায় গালি দিয়েই চলেছে । কিছুক্ষণ পর লোকটি ওর বন্ধুদের কথায় শান্ত হল । গাড়িতে চড়ে রাজার হালে হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল । আশেপাশের লোকজনও আস্তে আস্তে সেখান থেকে  চলে যেতে শুরু করেছে । তামাশা শেষ , থেকে কি করবে ? আমি রিকশাওয়ালা লোকটিকে হাত ধরে উঠালাম । ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললাম ,

বাড়ি চলে যান । আজকে আর রিকশা চালাবার দরকার নেই ।

রাস্তা দিয়ে এক মনে হাঁটছি । খুব মনে  হচ্ছিল । লোকটিকে কিছু টাকা সাহায্য করলে বোধহয় খুব ভালো হত । কিন্তু কি করার, সামর্থ্যে কুলালো না । সত্যি বলছি , আমি নিজেকে অনেক দুঃখী ভাবতাম । ভাবতাম হয়ত সৃষ্টিকর্তা সমস্ত দুঃখ আমার মধ্যে পুরে দিয়েছে । কেউ যখন আমার সাথে কথা বলতে আসতো  আমর মুখ গোমড়া চেহারা দেখে আমাকে প্রায়ই বলত

কিরে অত দুঃখী চেহারা বানিয়ে রেখেছিস কেন ?

আমি বলতাম , আমি যে দুঃখে আছি তাই ।

কিন্তু আজ বুঝতে পারলাম আমার চেয়েও এই দুনিয়ায় দুঃখী মানুষ আছে । এতটাই দুঃখী , যাদের কোন মাথা গোঁজাবার কোন ঠাই নেই , দুবেলা দুমুঠো ঠিক মত খেতে পায় না । একটু বেশি রোজগারের আশায় তারা চলে আসে এই ঢাকা শহরের মত বিশাল মায়াহীন নগরীতে । এসে তাদের সহ্য করতে হয় মানুষের লাঞ্ছনা , অত্যাচার । রাতের বেলায় ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গেলে আপনি প্রতিদিনই দেখতে পাবেন কত মানুষ ফুটপাতে শুয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে । তাদের ছেলেমেয়েরা কিছুদিন স্কুলে গেলেও মাঝাপথে গিয়ে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে । অসহায় বাবা মারা কিছুই বলছে না , হয়ত তারা ধরেই নিয়েছে লেখাপড়া শিখে হয়ত তাদের ছেলেমেয়েরা কোন বড় মাপের মানুষ হতে পারবে না । এই সমস্ত ছেলেমেয়েরা খুব অল্প বয়সেই জীবনের সংগ্রাম অর্থাৎ কাজ করতে শুরু করে কোন  গার্মেন্টসে বা কোন শিল্প-কারখানায় , অথবা সমাজের জন্য ভয়ংকর কোন পেশায় ।

আমার মা আমাকে প্রায়ই বলত , বাবা । নিজেকে যদি সুখী দেখতে চাও , তবে তোমার চেয়ে যারা দুঃখে আছে তাদের দিকে তাকাও । দেখ তারা কত দুঃখে আছে । তাহলেই বুঝবে , তুমি কত সুখে আছ ?

মার এই সহজ কথাটা বুঝতে আমার এত সময় লেগে গেল । আসলে মানুষের স্বভাবই এমন ,আমরা পরিস্কার জিনিসগুলো সহজে চোখে দেখি না ।গরীবের প্রতি এই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ব্যাপারটা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভালোমতই চোখে লেগেছিল । তিনি তাঁর জীবনের শেষ জনসভায় বলেছিলেন ,

শিক্ষিত সমাজকে একটা কথা বলব । আপনার চরিত্রে পরিবর্তন হয় নাই । একজন কৃষক যখন আসে খালি গায়ে লুঙ্গি পরে আমরা বলব এই বেটা কোথকে আইছিস ? বাইরে বয় , বাইরে বয় । একজন শ্রমিক যখন আসে , বলি , এখানে দাঁড়া । এই রিকশাওয়ালা ওভাবে চলিস না । তাচ্ছিল্যের সঙ্গে  কথা বলেন । তাদের তুচ্ছ করেন । এর পরিবর্তন করতে হবে । ওদের সম্মান করে কথা বলুন । ইজ্জত করে কথা বলুন । ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার  সাংসদ চলে ।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বাসায় পৌঁছে গেছি টেরই পেলাম না । বাসায় ঢুকতেই  দেখি বাবলি দিব্যি হেসে খেলে বেড়াচ্ছে । ওর জ্বর সেরে গেছে । সায়মা আমার দিকে এক গাল হেসে তাকালো । আমার নিজেকে খুব বোকা মনে হচ্ছে । আমি এতদিন ধরে সুখ খুঁজে বেড়াচ্ছি । কিন্তু সুখতো মনের ভিতরে । তাকে বাইরে খুঁজলে কি আর পাওয়া যায় । সৃষ্টিকর্তার কাছে লাখো সুখরিয়া তিনি আমাকে কোটি কোটি গরীব দুঃখী মানুষ থেকে অনেক সুখে রেখেছেন । এই কথা মনে সবসময় ভাববেন । দেখবেন আপনি কতটা সুখী । 

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 477

মন্তব্য