slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

হেফাজতের ষড়যন্ত্রে ব্যবহার হলো প্রান্তিক শিশুরা

একটি কাতর শিশুর মুখ। ভয়ার্ত তার দৃষ্টি। আশ্রয় নিয়েছে পিটুনি দেয়া পুলিশটির পিছনে।  নিজেকে বাঁচাতে  আকড়ে ধরেছে পুলিশটিকেই।  ফেসবুকে এমনি একটি ছবি ।মাদ্রাসায় পড়া প্রান্তিক এক শিশুর ছবি। যে রাজনীতি বোঝেনা। রাষ্ট্র তার কাছে দুর্ভোদ্য।  তার কাছে চরম সত্য কোরবানির চামড়া সংগ্রহ। কারো মৃত্যুহলে  চল্লিশার দিন পেটপুরে গরুর মাংস খাওয়া। জীবনে এই হয়ত তার প্রথম ঢাকায় আসা। কেন এসেছে তাও হয়তো জানে না। মাদ্রাসার হুজুর বলেছে যেতে হবে।  হুজুরের কথায় তাদের উঠাবাসা।এই প্রান্তিক শিশুদের জন্য রাষ্ট্র কান্না করে না। যারা রাষ্ট্র চালায় তারা এই শিশুদের করুনা করে। পরকালের লোভে এতিম খাওয়ায়। নিজের ছেলের খৎনায় খাওয়ায়। আর কাটা লিঙ্গের শক্তির জন্য দোয়া করায়।  নিজের লিঙ্গ ঢাকার মতো তার  হয়তো একটিই পায়জামা। তবু এই মাদ্রাসার শিশুরা দোয়া করে অসংখ্য উচ্চমার্গের লিঙ্গের জন্য। যেন ইহকালে সুখ পায় ও পরকালে আজাব মাফ হয়।

এই শিশুদের উপর ভর করা শ্রেণী হলো হুজুর। কত নামের কত বাহারের হুজুর। সাফি, বাবুপুরি ,দেওয়ানবাগি, নাগরি আরো কত নাম না জানা  হুজুর।  মেহেদি রাঙ্গানো দাড়িতে ঝলমলে তাদের চেহারা। মতাসিন শ্রেণীর সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করে তারা। প্রান্তিক মানুষদের বঞ্চিত রাখার ভাগবাটোয়ারা। ওয়াজ আর ষড়যন্ত্রের ভাগবাটোয়ারা। ব্যবহার করা হয় ধর্মকে। প্রান্তিক মানুষ  নিরুপায়। হুজুরদের হাতেই তুলে দেয় সন্তানকে। কিছু না হউক ইহকালে মাথাগুজার স্থানতো পেল। আর গরীবের পরকালতো রয়েছেই। হেফাজতের নামে এই সব বাচ্চাকে ব্যবহার করলো হুজুরেরা। নিজেরা দিনভর লুটপাট করলো। আর গুলির মুখে নির্যাতনের মুখে এতিম বাচ্চাদের ফেলে রেখে চলে গেল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠির এই শিশুরা কেন মাদ্রাসায় আসে। আর কেনই ঢাকায় এতো মাদ্রাসা তার একটি উত্তর খোঁজতে গিয়ে যা দেখেছি তাই এ লেখায় তুলে ধরলাম।

ঢাকার শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের মানুষের সন্তান ও দরিদ্র এতিমদের প্রধানতম শিার স্থান ফুরকানিয়া ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা। বস্তিতে বসবাসকারী শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের একমাত্র নিরাপদ স্থান এ মাদ্রাসাগুলো। শুধু ধর্মীয় কারণে তারা সন্তানের শিার জন্য মাদ্রাসা বেছে নিচ্ছেন তা নয়। বাস্তবতার কারণেও ইচ্ছার বিরুদ্ধে তারা শিশুদের মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে দরিদ্র মানুষেরা নিজস্ব অর্থেই চালাচ্ছেন এ শিা। এ দ্ররিদ্র শ্রমজীবীরা হলেন গার্মেন্টকর্মী, গৃহকর্মী, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, ফুটপাথের দোকানদার থেকে শুরু করে এধরনের কাজের সবাই। ঢাকার মসজিদ সংলগ্ন কয়েকটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা পরিদর্শন করে এ চিত্র দেখা গেছে।

তেজগাঁওর একটি গার্মেন্টে কাজ করেন মৌসুমি বেগম। গত ৮ বছর যাবত তিনি বাংলামটরের একটি বস্তিতে স্বামীসহ বসবাস করেন। তার ৫ বছরের মেয়ে আয়শাকে দিয়েছেন তেজগাঁওর একটি মহিলা মাদ্রাসায়। আর ৪ বছরের ছেলে নাসির হোসেনকে দিয়েছেন বিয়াম সংলগ্ন জামিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিম খানায়। প্রতিমাসে মাদ্রাসায় আবাসিক থাকা খাওয়া ও পড়াশুনা বাবদ তার খরচ ১৮শ টাকা। ছেলেটির জন্য মাসে মাদ্রাসায় দিতে হয় ১ হাজার টাকা। আর মেয়েটির জন্য দিতে হয় ৮০০ টাকা। তিনি জানান, আমাদের গরিবদের জন্য মাদ্রাসাই ভালো জায়গা। আমরা স্বামী-স্ত্রী সারাদিন ঘরের বাইরে কাজে থাকি। ছেলেমেয়েদের কোথায় রেখে যাবো। তাই মাদ্রাসায় দিয়ে দিয়েছি। বাইরে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে। একটু লেখাপড়া শিখা দরকার। বস্তিতে যে ঘরে থাকি সেখানে আমাদের দুজনের শোয়ার জায়গা হয়। সন্তানদের তাদের কোথায় ঘুমাতে দেই বলেন। এখন ছেলেমেয়েদের শোয়ার বিষয়েও চিন্তা করতে হয় না। যখন ছোট ছিল, বস্তিতে আরও কয়েকজনে মিলে একজন বয়স্ক বুয়াকে ভাড়া করেছিলাম তাদের খাওয়ানোর জন্য। এখন ওরা বড় হয়ে গেছে। আমার মেয়েটা কোরান শরিফ শিখছে। একটু বড় হলে গ্রামে নিয়ে বিয়ে দিয়ে দিব। কোরআন মুখস্থ জানা মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। আর ছেলেটা হাফেজ হয়ে মাদ্রাসা থেকে বের হলে কিছু একটা করতে পারবে। মৌসুমির পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন আরও একজন শ্রমজীবী মা। তিনি তার সন্তানকে একই মাদ্রাসায় দিয়েছেন। তিনি জানান, তার স্বামী নেই। মানুষের বাসায় ঠিকা ঝিয়ের কাজ করেন। সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন বাসায় কাজ করেন। তিনি তার সন্তানকে সকালে মাদ্রাসায় দিয়ে যান। রাত ৮টার পর বাসায় নিয়ে যান। এর জন্য তাকে মাদ্রাসায় ৮০০ টাকা দিতে হয়। কারণ, রাতের খাবার তিনি নিজেই খাওয়ান।

এ মাদ্রাসার পাশেই বিয়াম বিদ্যালয়। ইংরেজি ভার্সান, বাংলা ভার্সানÑ সব কিছুতেই পড়ছে সম্পন্ন ঘরের সন্তানরা। মায়েরা বসে আছেন স্কুলের সামনে। কখন ছুটি হবে। সিটি করপোরেশন তাদের বসার জন্যও বানিয়ে দিয়েছে ছাউনি দেওয়া বেঞ্চ। মাথার ওপর কোনো কোনো স্কুলের ছাউনিতে ফ্যানও ঝুলছে। ড্রাইভার অপো করছে তাদের বাচ্চাদের নেওয়ার জন্য। অথচ এ ড্রাইভারের সন্তানটি হয়তো কোনো এক হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার কে মুখস্থ করছে শুধু আরবি সুরা। বিয়াম শুধু একটি উদাহরণ। নিু আয়ের মানুষের শিার সঙ্গে অন্য আয়ের মানুষের শিার পার্থক্য ঢাকার সবকটি স্কুলে।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় কত সংখ্যক এ ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। তবে লালবাগ মাদ্রাসার হিসাবে ফুরকানিয়া ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা কম পে ২০ হাজার। তাদের মতে, এ ধরনের মাদ্রাসার হিসাব তারা সংগ্রহ করেন না। কারণ, এটি হলো প্রাথমিকপর্যায়ের লেখাপড়া। তারা এর পরের মাদ্রাসার হিসাব সংরণ করে। এ হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ছাত্ররা কায়দা, আমপাড়া ও কোরআন মুখস্থ করে। এই পড়া শেষ করার সময় ৪ বছর। এ চার বছরে ছাত্র-ছাত্রীরা হিফজুল পাস করে। পরে তারা কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। এটি ছাত্র ছাত্রীদের ইচ্ছেমতো। ঢাকায় লালবাগ মাদ্রাসার অধীনে কওমি মাদ্রাসা রয়েছে ১০০টি। আর গেন্ডারিয়ার বাফেকুল মাদ্রাসার অধীনে রয়েছে ৫০০ মাদ্রাসা।

পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড়ের হাফিজি মাদ্রাসার শিক হাফেজ সিদ্দিকুর রহমান জানান, মাদ্রাসাগুলো ছাত্রদের বেতনে চলে। তার বাইরে বিভিন্ন লোক দান-খয়রাত করেন। কোনো কোনো সময় মিলাদ ও জিয়াফত দিলে ছাত্রছাত্রীদের খাওয়ানো হয়। গরিবের সন্তান। আমরাই পাড়াই। গার্মেন্টে কাজ করে যে মা তার পক্ষে তো বড় স্কুলে পড়ানো সম্ভব না। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে কে বাচ্চাদের নিয়ে যাবে। স্কুলের পরে বাচ্চাকে কে নিয়ে আসবে। এসব বিষয়তো রয়েছেই। মাদ্রাসায় দিলে সব দ্বায়িত্ব আমরাই নেই। কিছুটা বাংলা ও অংক শিখাই। আর কোরআন শিায় তালিম দেই। এতিম বাচ্চাদের বিষয়ে বলেন, কোনো সম্পন্ন আত্মীয় বা ব্যক্তি এতিমদের খরচ দেয়। এরজন্য তিনি নিজেও বিভিন্ন সম্পন্ন ব্যক্তির খোঁজ করেন বলে জানান। যাতে একটি এতিম বাচ্চার খরচ তিনি বহন করতে পারেন।

বিজিএইএর হিসাবে শুধু শতভাগ কমপ্লায়েন্স রয়েছে এমন কারখানায় শিশুদের থাকার জন্য ডে কেয়ার রয়েছে। তাও এসব ডেকেয়ারে শিশুরা ৪ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত থাকতে পারে। সব মিলিয়ে পোশাক শ্রমিকদের ডে কেয়ারের সংখ্যা ২ হাজার।

এনজিও কর্মজীবী নারীর চেয়ারম্যান শিরিন আক্তার জানান, স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের ডে কেয়ারের কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের রাখার জন্য কয়েকটি ডে কেয়ার থাকলেও অন্যদের এ ব্যবস্থা নেই।

উল্লেখ্য, সারাদেশে ১৯৬৫ সালে কওমি বা হাফিজি মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল ১৮৮টি। ১৯৭২-৭৩ সালে এ ধরনের মাদ্রাসা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ। এ মাদ্রাসা থেকে কত সংখ্যক ছাত্র হাফেজ হয়েছে তার কোনো হিসাব কারো কাছে নাই। তবে এর উপরের পড়াশুনা কওমি মাদ্রাসা ২০০১ সালে তাদের ম্যাট্রিক সমমানের পড়াশুনার একটি রেজাল্ট ইনকিলাব পত্রিকায় প্রকাশ করে। সেখানে ১১ হাজার ৮৪ জন পরীক্ষার্থী কেন্দ্রীয়ভাবে কওমি পরীায় অংশগ্রহণ করেছিল। এরমধ্যে ২ হাজার ৫৪৬ জন ছিলেন নারী।

12345
Total votes: 448

মন্তব্য