slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

ঈদের দিনে খুচরা আলাপ

ঈদ শুভেচ্ছা

সেই ২০০৩ সালে পুত্রবধু তিনটা অর্কিডের টব এনেছিল। তখন থাকতাম ধানমন্ডির সরকারি বাসায়। সরকারি চাকরি শেষ, বাসা ছেড়ে দিতে হলো। স্ত্রীর এক বান্ধবী আদাবরে পাশাপাশি দুটো ফ্লাটের মালিক। একটায় নিজেরা থাকে, অন্যটা ভাড়া দেয়। তার অনুরোধ ফেলতে না পেরে সে বাসা ভাড়া নেওয়া হলো। অন্যান্য মালপত্রের সাথে অর্কিডের টবও ট্রাকে উঠে গেল সেখানে। একটা অর্কিডের টব ক্ষতিগ্রস্থ হলো কিছুটা। পরে ধীরে ধীরে সেটা একসময় মরে গেল। একবছর কাটলো সে বাসায়। পুত্র আর পুত্রবধু পড়াশুনা করতে ইংল্যান্ডে চলে গেল। তার আগে মেয়েও তার সংসারের সব জিনিসপত্র আমার ঘাড়ে চাপিয়ে জাপানে চলে গেছে। আমাদের ঢাকা বাসের প্রয়োজন আর থাকলো না।

অতএব, চলরে মন আপন ঠিকানায়! তল্পি-তল্পা গুটিয়ে তিন সংসারের মালপত্র ট্রাকে ভরে নিয়ে চলে এলাম খুলনায়। সঙ্গী হলো দুটো অর্কিডের টব। এবারে আরও একটা আহত অবস্থায় এলো খুলনা পর্যন্ত। এখানে রাখি, ওখানে রাখি- শরীর স্বাস্থ্য তাদের ভালোই হয় না। কেটে গেল আরও দুটো বছর। এক টবে দুটো তিনটে করে গাছ, একটা শুকালে নতুন একটা জন্মায়। কিন্তু সংখ্যায় বাড়ে না, ফুল আর ফোটে না। আরো দু’বছর পেরিয়ে গেল। যথা পূর্বং, তথা পরং। ইতোমধ্যে মেয়ে ফিরে এলো জাপান থেকে। শুরু হলো আবারও খুলনা-ঢাকা, ঢাকা-খুলনা ছুটাছুটি। পুত্র-পুত্রবধুও বছর চারেক পরে ফিরে এলো দেশে। তাদের একটা বাচ্চাও হলো দেশে ফেরার অল্পদিনের মধ্যে। এবারে আর খুলনার বসবাসে ক্ষান্ত দেওয়া ছাড়া গত্যান্তর থাকলো না।

অযত্নে অবহেলায় কোন কিছুই টিকতে চায় না। অর্কিডের অবস্থাও তথৈবচ। বদ্ধ ঘরে আটকা থেকে দুর্বলটা অল্পদিনের মাঝেই ভবলীলা সাঙ্গ করলো। সবেধন নীলমনিকে নিয়ে চিন্তা আমার কোন কূলকিনারা পায় না। শেষ অবধি দিলাম তাকে আম গাছের তে-ডালায় বসিয়ে। আম গাছে বসে অর্কিড আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচায়। কিন্তু ফুল ফোটে না। বছরের পর বছর কেটে যায়।

Orchid at my houseঅর্কিড

এরই মাঝে কেটে গেছে নয়টি বছর। এতদিন পরে এবারে অর্কিডের মুখে ফুটেছে হাসি। সে হাসি যদিও কিছুটা ম্লান, তবুও তো হাসি! নয় বছর লালন-পালনের পরে ফুটেছে যে ফুল, সেটাই এবারের ঈদে আমার জন্য সব চেয়ে বড় ঈদের আনন্দ, ঈদের শুভেচ্ছা।

আমার কুরবানীর গরু

কুরবানী ২০১২

ঘরে ঘরে আনন্দ। মনের আনন্দে অনেকেই সাধ্যের সীমা ছাড়িয়ে দেখনেওয়ালা গরু কিনেছে কুরবানী দেবার জন্য। আমার গরু তাদের গরুর কাছে তুচ্ছাতিতুচ্ছ। তা’ বলে কি আমার কোন দুঃখবোধ আছে? একটুও না। আমার সাধ্যের সীমা ছাড়ানোর ইচ্ছা কোন দিন ছিল না, এখন তো আরও নেই।

প্রথম আলোর ঈদ উপহার
প্রথম আলোর প্রত্যেক পাঠকের জন্য ঈদ উপহার। প্রকাশিত হয়েছে ২৫ অক্টোবর ২০১২ তারিখে। এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হয়েছে তানিজিনা হোসেনের লেখা গল্প “মতস্যমাতাপুরান”। গল্প পড়ে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, লেখক একজন ডাক্তার। ডাক্তারদের কাজ মানুষের মুখে হাসি ফুটানো। তবে ডাক্তার তানজিনা হোসেন কি করেছে দেখা যাক। এই গল্পের শেষ কয়েকটি লাইন। "আমি একটা খারাপ মেয়েমানুষ ম্যাডাম, মেয়েটা মুখ খোলে এবার, কার সাথে কোন ভুলে যে এই বাচ্চাটা পেটে আসছিল টের পাই নাই। কিন্তু ক্যান জানি ফেলেও দিতে পারি নাই। নয় বছর ধইরা এই মেয়েটারে ঘাড়ে নিয়া বেড়াইতেছি। দুই সপ্তাহ পরপর রক্ত যোগাড় করা, রাজ্যির ওষুধপত্র, ডাক্তারের ফি, হাসপাতালের টাকা, ইনসুলিন ইনজেকশন। আর কত? এত রোজগার করতে হইলে দিনে-রাইতে কতবার শুইতে হয় কন? কার না কার রক্তে কী রোগ আছিল, থ্যালাসেমিয়ার বীজানু, তার চেহারাও মনে নাই, অথচ তার যন্ত্রণা আমারেই বইতে হইব ক্যান? মাঝে মাঝে মনে হইত গলা টিপা মাইরা ফেলি। পারতাম না, কারণ, সে ছাড়া এই জগতে আমার আর কেউ ছিল না। আইজ সেও আমারে ছাইড়া গেল। আমার কত শান্তি! আমার পরানডা জুড়াইল।

বলতে বলতে কাঁদতে শুরু করলো সে। এই প্রথমবারের মতো সন্তানের জন্য কাঁদতে দেখলাম মেয়েটিকে। কাঁদতে কাঁদতে সে দরজা ধরে মেঝেতে বসে পড়েছে। একসময় শুয়েও পড়েছে। কিন্তু কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসছে না। নার্স, ওয়ার্ডবয়, ক্লিনার, অন্য রোগীর লোকজন – সবাই ঘৃণাভরে তাকিয়ে আছে সদ্য সন্তানহারা মায়ের দিকে। হায়, এই দুনিয়ায় এমন হতভাগা মাও আছে যার কান্নায় কেউ সামিল হয় না!"

আজ ঈদের দিন। আজ খুশির দিন। আজ আমি তার কান্নায় সামিল না হয়ে পারলাম না। হায়! সে মা জানতেও পারলো না, আমার মত একজন অতি নগন্য মানুষের চোখের পানি পড়েছে তার কষ্টে।

ঈদ মুবারাক। সকলকে জানাচ্ছি ঈদের শুভেচ্ছা। ভালো থাকুন। জীবন হোক আনন্দময়।

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 558

মন্তব্য

শশাঙ্ক বরণ রায়-র ছবি

আপনাকেও ঈদের শুভেচ্ছা, ঈদ মুবারক! অর্কিডের ছবিটা চমৎকার।

গোপনে বলি, আমি আদাবরে থাকি। এই সূত্রে নিশ্চয়ই আপনার সাথে কিছুটা আত্মীয়তার দাবি করতে পারি!

........................................................

আদিবাসী বাঙ্গালী যত প্রান্তজন
এসো মিলি, গড়ে তুলি সেতুবন্ধন

নাজমুল হুদা-র ছবি

 অবশ্যই! যে যেখানেই থাকি না কেন ভাই, আত্মার বন্ধনই আসল। যেখানে তা আছে, সেখানেই তো আত্মীয়তা। রক্তের সম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্কে যে আত্মীয়তা, সেখানে যদি আত্মার বন্ধন না থাকে, তবে সে বন্ধন নেহাতই লোকজ।

শুভেচ্ছা।

শশাঙ্ক বরণ রায়-র ছবি

সহমত এবং ধন্যবাদ।

........................................................

আদিবাসী বাঙ্গালী যত প্রান্তজন
এসো মিলি, গড়ে তুলি সেতুবন্ধন

খালিদ-র ছবি

যে হাসি ফুটতে নয় বছর লেগেছে, ম্লান হোক আর যাই হোক, তা অমূল্য!

নাজমুল হুদা-র ছবি

 চমৎকার বলেছেন।

ধন্যবাদ ভাই খালিদ।

আজাদ-র ছবি

অনেক সাধনায় ফুল ফোটে, গভীর সাধনার ফুল ঝরে যায়। হাসি-কান্নার, আনন্দ-বেদনার এক জটিল প্রকাশ আপনার এই লেখা। তবু এই আত্মতুষ্টির শুভকামনা- সকলের জীবন সুন্দর হোক, আনন্দময় হয়, জয হোক সকলের।

নাজমুল হুদা-র ছবি

 এত সুন্দর করে বলেছেন কথাগুলো যে বারবার পড়তে ইচ্ছে করছে।

শুভ কামনা ভাই আজাদ।

খুচরা আলাপ ভাল লেগেছে।

-------------------------------------------------------------

বয়ে চলি অসীমের প্রান্তে

নাজমুল হুদা-র ছবি

 শুভেচ্ছা জানবেন স্রোত ভাই।

সাহাদাত উদরাজী-র ছবি

অর্কিড পর্যন্ত পড়ে মনে মনে ভাল কমেন্ট সাজাছিলাম।

আপনার গরু দেখে বেশ খুশি হলাম।

শেষের ঘটনায় আর কিছু বাকী থাকল না।

নো কমেন্টস।

নাজমুল হুদা-র ছবি

 ধন্যবাদ, শুভেচ্ছা।

মন্তব্য