slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

গল্প - নাটকের মেয়ে (পর্ব -০৫)

উনি আবারও তাঁর লেখার মধ্যে হারিয়ে গেলেন। আমি সামনে বসে থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তাঁর মনোযোগ দেখার মতো। আগেকালের মুণিঋষিরা বোধ হয় এই রকম মনোযোগ দিয়েই ধ্যান করতেন। তাদের সামনে স্বর্গের অপ্সরা থাকলেও ধ্যান ভাঙ্গত না।
তিনি অল্প লিখছেন। আবার ভাবছেন। আবার লিখছেন। হঠাৎ আমার মনে হল তিনি আমার সামনে ভাব নিচ্ছেন না তো ? অনেক পুরুষ লোক মেয়েদের সামনে এই রকম ভাব নেয়। ভাবখানা এমন তিনি নারী জাতি সম্পর্কে নির্বিকার। ঠেকায় পড়ে তার জীবনের সঙ্গে মা ও বোনকে জড়াতে হয়েছে। নইলে তিনি নারী বর্জিত জীবনযাপন করতেন।
এরা হল বিড়াল স্বভাবের। মিনমিনে শয়তান। বিড়াল যেমন ইঁদুর ধরার জন্য ওৎ পেতে থাকে, এরাও তেমনি ওৎ পেতে থাকে। কিন্তু তাদের এই ওৎ পাতাটাকে বেশির ভাগ মেয়ে ভালো মানুষী বলে ভুল করে এবং ফাঁদে পড়ে। এরাই মেয়েদের বেশি ক্ষতি করতে পারে।
এই শালা মনে হয় সেই কিসিমের।
এই শালা কোন কিসিমের সেটা আমার মাথা ব্যথা নয়। আমার দরকার সুযোগ। টিভি স্টার হওয়ার জন্য আমি মরিয়া। যে কোন মূল্যে আমি টিভি স্টার হতে চাই। আমি এমন একটা ঘুঘু যে ফাঁদ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ফাঁদ পাচ্ছি না, সুযোগও হচ্ছে না। পরিকল্পনা আছে, যদি আমি ফাঁদে না পড়তে পারি, তবে আরেক জনকে ফাঁদে ফেলব। কোন না কোন ফর্মুলা তো কাজে লাগবেই।
‘আপনি তিন দিন থাকতে পারবেন তো ?’
তার প্রশ্নে আমি সচকিত হলাম। বোকার মতো বললাম, ‘জ্বী।’
‘আমি জিজ্ঞেস করছি, আপনি তিন দিন থাকতে পারবেন তো ?’
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কিসের কথা বলছেন উনি ? কোথায় থাকতে হবে ? কার সাথে থাকতে হবে ? তিন দিন কেন সুযোগ পেলে আমি তিরিশ দিন থাকতে পারি। কিন্তু এ কথা তো প্রকাশ্যে বলা যায় না। আমি হা হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি হাসলেন। বললেন, ‘ নাটকটার শুটিং তিন দিন হবে। আপনি থাকতে পারবেন তো ?’
‘কোথায় থাকতে হবে ?’
‘সম্ভবত পুবাইলে শুটিং হবে। পুরো ইউনিট তিন দিন থাকবে। আপনাকেও থাকতে হবে।’
‘পারব।’
‘তাহলে তো সমস্যা নাই। অনেক সময় নতুন আর্টিস্টরা বিষয়টা বোঝে না। রাতে থাকতে চায় না। তাই কনফার্ম করে নিলাম। আপনার কোন সমস্যা নেই তো ?’
‘না। কিসের সমস্যা ?’
‘আপনার বাসা থেকে আপত্তি করবে না তো ?’
আমার বলতে ইচ্ছা করল, আই ডোন্ট কেয়ার। কিন্তু বললাম,‘না, বাসায় সমস্যা নেই। থাকতে পারব।’
মিথ্যা বললাম। বাসায় বিরাট সমস্যা। মা হৈ চৈ করবেন। বাবা বেঁচে থাকলে বাবাও হৈ চৈ করতেন।
তিনি বললেন, ‘তাহলে আর কী , এই ডিরেক্টরিতে আপনার নাম আর ফোন নাম্বার রেখে যান।’
তিনি একটা বড় সাইজের ফোন ডিরেক্টরি এগিয়ে দিলেন। আমি নাম ও ফোন নাম্বার লিখলাম।
তিনি আবারও লেখায় ডুব দিয়েছেন। গভীর জলে ডুব দিয়েছেন। গভীর জলের মাছের তো গভীর জলেই ডুব দেয়ার কথা। শালা, আমাকে কোথায় থাকার কথা বলছে কে জানে ?
আমি তার দিকে তাকালাম। তিনি টের পেলেন। বললেন,‘লিখেছেন ?’
আমি তার দিকে ডিরেক্টরি এগিয়ে দিলাম। তিনি দেখলেন। তারপর ডিরেক্টরি বন্ধ করে টেবিলের পাশে রেখে দিলেন। বললেন, ‘আমার এসিস্ট্যান্ট আপনাকে ফোন দেবে। যারা নতুন তাদের রিহার্সেল করাব। আপনাকে কয়েক দিন বিকেলে আসতে হবে।’
‘আচ্ছা, আসব।’
‘আমি একটু ব্যস্ত। নইলে আপনার সঙ্গে গল্প করা যেত।’
আমি আমার গলার দিকে তাকালাম। না, ভি গলার অবস্থান বিপজ্জনক জায়গায় নয়। রানওয়ে দেখা যাচ্ছে না। তাই তো মুণিঋষির ধ্যান ভাঙ্গেনি। আমিও একদিন তিলোত্তমার মতো মুণিঋষির ধ্যান ভাঙ্গাব। কত পুরুষ দেখলাম। তলে তলে সব এক। শকুন যতই উপরে উঠুক, তার নজর থাকে নিচে।
বুঝলাম, তিনি চান আমি যেন চলে যাই। উঠে দাঁড়ালাম। তিনি রিভলভিং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি দরজা দিয়ে বেরুবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালাম। ঘুরে দাঁড়িয়েই অবাক হয়ে গেলাম। পিছনের দেয়ালের পুরোটা জুড়ে ছবি। ফালি ফালি করে ৫ জন বিখ্যাত ফিল্ম ডিরেক্টরের ছবি। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, জহির রায়হান ও আলমগীর কবীর। পুরো দেয়াল জুড়ে এই ৫ জন। আমি তাকিয়ে রইলাম।
তিনি পেছন থেকে বললেন, ‘এই ৫ জন হলেন বাংলা সিনেমার গুরু। ওদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ছবিগুলো লাগিয়েছি। কেমন হয়েছে ?’
আমি বললাম, ‘চমৎকার।’
তিনি আমাকে এগিয়ে দিলেন। দরজা খুলে আমাকে বিদায় জানালেন। আমি সিঁড়ি কোঠায় হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি কি তাহলে টিভিতে চান্স পেয়ে গেছি ? আমার কোন ক্রমেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
কিন্তু এই ব্যাটার আচরণটা বুঝলাম না। উনি আমার দিকে ভালো করে তাকালেন না পর্যন্ত। উনি কি মুণিঋষির জাত ? নাকি অতি ধুরন্ধর ? বড়শিতে মাছ গাঁথার পর যেভাবে খেলায় উনি কি সেভাবে খেলতে শুরু করেছেন ? আমি বড়শিতে গেঁথে গেছি, অথচ টেরই পাইনি। সময় মতো হ্যাচকা টানে আমাকে ডাঙ্গায় তোলা হবে। ডাঙ্গায় উঠে তড়পাতে আমার আপত্তি নেই। আমার দরকার চান্স । যে কোন মূল্যে।
কয়েক দিন পর এক অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এল। তিনি নিজের পরিচয় দিলেন। মাংকি ক্যাপ ডিরেক্টরের এসিস্টেন্ট। নাম মনির। তিনি জানালেন, আমি যেন অবশ্যই পরের দিন বিকেল চারটায় উনাদের রিহার্সেলে থাকি।
পরের দিন যথাসময়ে রিহার্সেলে গেলাম। এবার আর ভি গলার টি শার্ট আর টাইট জিন্স পরলাম না। খামোখা পাবলিক গরম করে লাভ নেই। পরলাম থ্রি পিস। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে হালকা মেকআপ নিলাম।
রিহার্সেলে গিয়ে তো আমি অবাক। অভিনেতায় অভিনেতারণ্য। এই শহরে এত অভিনেতা থাকে, সেটা আমার ধারণায় ছিল না। আসলে ওটা রিহার্সেল ছিল না, ওটা অডিশন। আমরা সবাই রিসেপশনে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মেয়েদের মধ্যে অনেকেই টাইট ডিন্স আর টি শার্ট পরে এসেছেন। গরম সাজ। কে কার চেয়ে বেশি গরম সেটারই প্রতিযোগিতা। একেক জনের চেহারায় মাঞ্জাটা ভালোই পড়েছে। বিউটি পার্লারগুলো ইদানিং শাকচুন্নির সাজ চালিয়ে দিচ্ছে। আবহাওয়া পুরো গরম হয়ে গেছে।
অন্য দিকে, কে কত বড় অভিনেতা, কার কত কত মঞ্চ নাটকে কাজ করার অভিজ্ঞতা, কার এই সুযোগ না পেলেও চলবে - এই সব খাজুড়ে আলাপ চলতে লাগল। আমি চুপ করে বসে রইলাম। যে যত বর্ষে, সে তত গর্জে না।
এক সময় আমার ডাক পড়ল। গেলাম। একটা মাঝারি আকৃতির রুম। পুরোটা খালি। একপাশে ৬ টি চেয়ার । ৫ চেয়ারে বসে আছেন ৫ জন। একটা চেয়ার খালি। মেয়ে রিসেপশনিস্ট আমাকে তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেল।
আমি তাদের দিকে তাকালাম। মাংকি ক্যাপ ডিরেক্টর ছাড়া বাকিরা অপরিচিত। কিছুটা নার্ভাস লাগছে। আমি সালাম দিলাম। তারা মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলেন।
মাংকি ক্যাপ প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি তো নাটকের দলে কাজ করেন, তাই না ?’
আমি স্পষ্ট গলায় উত্তর দিলাম, ‘জ্বি।’
‘বলেন তো নবরস কয় টি ?’
‘নয়টি।’
‘গুড। নামগুলো বলতে পারবেন ?’
‘পারব। শৃঙ্গার রস, হাস্য রস, করুণ রস, রৌদ্র রস, বীর রস, ভয়ানক রস, বিভৎস রস, অদ্ভুত রস ও শান্ত রস।’
তিনি মিষ্টি করে হাসলেন। বুঝলাম, খুশি হয়েছেন। বললেন, ‘রিপু কয়টি জানেন ?’
‘৬টি।’
‘কী কী ?’
‘কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য।’
‘বলেন তো, মাৎসর্য মানে কী ?’
‘মাৎসর্য মানে হল পরশ্রীকাতরতা। মানে অন্যের উন্নতি সহ্য করতে না পারা, মানে ঈর্ষা।’
তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘আপনি তো অনেক জানেন।’
আমি হাসলাম। বললাম, ‘আমাদের নাটকের দলে এগুলোর চর্চা হয়।’
তিনি অন্যদের দিকে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবেন ?’
অন্যরা না-সূচক মাথা নাড়ল। আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
আমি এসিটেন্ট ডিরেক্টর মনিরকে খুঁজে বের করলাম। মনির বলল, ‘ডিরেক্টর স্যার, আপনাকে থাকতে বলেছে।’
‘কেন ?’
‘তা তো জানি না।’
আমি খুশি হয়ে উঠলাম। এত দিনে ঔষধে ধরেছে। এবার মাংকি ক্যাপ ফাঁদ পাতবে। আমি ধরা দেব। আমি ঘুঘু পাখির মতো বোকা হয়ে যাব।
রিসেপশনে বসে বসে রিসেপশনিস্ট মেয়েটাকে দেখছি। টপস আর স্কার্ট পরেছে। কিন্তু মেয়েটার ফিগার ভালো না। আগাপাশতলা সমান। পোশাকে যতই স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, চেহারা থেকে গ্রাম্য ছাপ মুছে যায় নি। আমি কি ওর প্রতি ঈর্ষা বোধ করছি ? নইলে ওকে এত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছি কেন ?
বরং মাংকি ক্যাপ কী বলবে সেটা ভেবে বের করা যাক। মাংকি ক্যাপ খুব বিনয়ী গলায় বলবে, ‘আপনি কি কালকে আসতে পারবেন ?’
আমি বলব, ‘কেন নয় ?’
তার মুখ চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ভাববে, মেয়েটা কত লক্ষ্মী । কত সহজে ধরা দিচ্ছে। আসলে যে আমি তাকে ফাঁদে ফেলছি, সেটা সে বুঝতেও পারবে না। আমি চাই, ঘুঘু-ফাঁদ খেলাটা ভালোমতো জমুক। মাংকি ক্যাপ যা খুশি প্রস্তাব দিক আমাকে। আমি যে কোন প্রস্তাবেই রাজি। তবে ভেজা বেড়াল সেজে থেকে লক্ষ্মী লক্ষ্মী ভাবটা ধরে রাখব - যাতে করে মাংকি ক্যাপ বিভ্রান্ত হয়। দরকার হলে চূড়ান্ত মুহূর্তে কান্নাকাটি করে একাকার করে ফেলব। ওতে করে মাংকি ক্যাপ গলে জল হয়ে যাবে। আমার জন্য ওর মধ্যে একটা সফট কর্নার তৈরি হবে। আমি মামলা জিতে যাব। একেই বলে কাঁদিয়া মামলা জিত।
কিছুক্ষণ পর অডিশন রুম থেকে এসিস্টেন্ট মনির বেরিয়ে এল। আমাকে বলল, ‘কাল বিকেল চারটায় আসার জন্য স্যার আপনাকে বলেছে।’
‘আমি কি এখন চলে যাব ?’
‘হ্যা, আজকে বসে থেকে লাভ নাই।’
আমার বুক থেকে পাষাণ ভার নেমে গেল। বুঝতে পারছি, মাংকি ক্যাপ আমার জন্য ফাঁদ পেতেছে। আমি ঘুঘু পাখির মতো ধরা দিলেই টিভি স্টার হয়ে যাব।

চলবে .......

 

পর্ব -০১। পর্ব -০২পর্ব -০৩পর্ব -০৪

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 587

মন্তব্য

আজাদ-র ছবি

ফাঁদে যখন পড়তেই হবে দেরী করে লাভ কি? দ

দারুন জমে উঠেছে। ফাঁদে পড়ার অপেক্ষায় রইলাম...

শাহজাহান শামীম-র ছবি

ধন্যবাদ। শীঘ্রই পাবেন পরবর্তী পর্ব। 

আমিও অপেক্ষায়...দারুণ জমে উঠছে কাহিনি!

শাহজাহান শামীম-র ছবি

পড়ার জন্য ধন্যবাদ। 

সাহাদাত উদরাজী-র ছবি

আমি আছি সাথে...।

মন্তব্য