slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

গল্প - নাটকের মেয়ে (পর্ব -০৪)

এই রেজা ভাই আমার পেছনে আঠার মতো লেগে আছেন। আঠা মানে তো কঠিন আঠা - সুপার গ্লু। সকাল বিকাল ফোন। কখনও ফোন ধরি, কখনও ধরি না। আবার ফোন না ধরলে তিনি মাইন্ডও করেন না। পরের বার ফোন ধরলে এমনভাবে কথা বলেন, যেন আগে তিনি কোন ফোনই দেন নাই। তিনি আমাকে তার হোটেলে দাওয়াত দেন। আমি জানি এই দাওয়াত আসলে কিসের দাওয়াত। প্রকাশ্যে এই ব্যাটাকে ‘রেজা ভাই’ বলে গলে পড়লেও মনে মনে এই শালাকে ‘আঠা আঙ্কেল’ বলে ডাকি। শালায় আসলেই একটা সুপার গ্লু।
আমার সিক্সথ সেন্স বলছিল, পাঠা আঙ্কেল আমাকে ফোন দেবে। রাতে আঙ্কেলের ফোন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পেলাম ঠিক রাত ১২টায়। কেমন আছি, ভালো মতো বাসায় পৌঁছেছি কি না এই সব কথা বললেন। আমি হু হ্যা করে গেলাম।
তিনি শুরু করলেন আমার প্রশংসা পর্ব। আমি মেধাবী (জানি না)। আমি সুন্দরী (কয় কী !)। আমি সম্ভাবনাময়ী (হতে পারে)। আমি অভিনয় ভালো জানি (এটা সত্য কথা, নইলে পাঠা আঙ্কেলকে তার মুখের দুর্গন্ধের জন্যই চড় মেরে চলে আসতাম।) সুতরাং তিনি আমাকে হেল্প করতে চান। আমি যেন মিডিয়ায় তোলপাড় করতে পারি, সেটা তিনি দেখভাল করতে চান। যার নিজেরই কোন তোলপাড় নাই, সে কিভাবে অন্যকে তোলপাড় করে দেবে বুঝলাম না।
তিনি আমাকে আশ্বাস দিলেন, বাংলাদেশের সিনেমা জগতের সব দিকপাল তার বন্ধু, সুতরাং আগামী বছরখানেকের মধ্যে আমি দেশের সেরা নায়িকা হয়ে যাচ্ছি - কনফার্ম। কেবল আমি যেন উনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলি। আর উনি যা যা বলবেন, সেটা যেন অন্ধের মতো অনুসরণ করে চলি।
আমি উনাকে নিশ্চিত করলাম, উনি যে কত বড় মানুষ সেটা আমি জানি এবং আমি ২৪ ঘণ্টা ৭ দিন যোগাযোগ রাখব। আর তার সব কথা অনুকরণ করার জন্য পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাব। অবশেষে তার আঠালো প্যাচালে আমি যখন ত্যাক্ত বিরক্ত, তখন তিনি ফোনটা কেটে দিলেন। বুঝলাম, আরেকটা নতুন আঠা জুটল। আঠা নয়, পাঠা আঙ্কেল।
কিন্তু যথারীতি আমার কপাল ভালো না। গানের বাকি অর্ধেক আর শুটিং হল না। টাকা পয়সা নিয়ে ডিরেক্টর ও পাঠা আঙ্কেল কী এক গণ্ডগোলে জড়িয়ে গেল। দু’জনই দু’জনকে বলে, শালা বাটপার। পাঠা আঙ্কেল আমাকে নানা জায়গায় যেতে বলত, আমি বরাবরই এড়িয়ে গেছি। এই ব্যাটার মতলব আমি বুঝি। এক সময় পাঠা বোধ হয় হয়রান হয়ে গেল। তারপর ফোন করা কমিয়ে দিল। ইদানিং আর কোন ফোন পাই না।

হঠাৎ ফোনের শব্দে সম্বিৎ ফিরে এল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখি ফাপড়বাজ। আমাদের নাটকের দলের প্রভাবশালী সদস্য। কল ব্যাক করেছে।
আমি ফোন ধরলাম, ‘হ্যালো, ভাইয়া।’
‘তুমি ফোন করেছিলে।’
‘হ্যা, কেমন আছেন ?’
‘ভালো না। ব্যবসাপাতি খারাপ । শেয়ার ব্যবসার কথা তো জানই। বিরাট ধরা খাইছি।’
আমি মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম। উচিত শিক্ষা হয়েছে। না জেনে শেয়ার ব্যবসা করতে যায় কেন ? এত লোভ ভালো না।
‘তা তুমি ফোন করেছিলে কেন ?’, ফাপড়বাজ জিজ্ঞেস করল।
‘ডিরেক্টর সিরাজের একটা নাটকে চান্স পেয়েছি। তিনি যেতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, কেবল আপনি বলে দেয়াতেই উনি আমাকে চান্স দিচ্ছেন। আপনাকে ধন্যবাদ দিতে ফোন করেছিলাম।’
‘তাই নাকি ! আমি তো জানি না।’
‘আপনাকে হয়তো বলতে ভুলে গেছে।’
‘ভালো হয়েছে। তুমি তো স্টার হয়ে যাবে। আমাদের কথা মনে রেখ।’
‘আপনার এই হেল্প আমার মনে থাকবে। কিন্তু রানা ভাইকে যেন বলবেন না।’
‘কী বলো ! আমার কি ব্রেইন নষ্ট নাকি ?’
ফাপড়বাজ আরও কিছু কথা বলে ফোন কেটে দিল। ফাপড়বাজকেই আমি কেমন সুন্দর করে ফাপড় মেরে দিলাম। আসলে তো মাংকি ক্যাপ ডিরেক্টর সিরাজের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন রিমা আপা। রিমা আপারও খুব ইচ্ছা টিভি নাটকে কাজ করবেন। কিন্তু রানা ভাইয়ের জন্য পারছেন না।

বাস ঝিম মেরেই আছে। আমার পাশের আঙ্কেল ঘুমাচ্ছেন। তবে আঙ্কেলের পাশে দাঁড়ানো কিছু ইয়াং ছোকড়া ফোস ফোস করে শ্বাস ছাড়ছে। টি শার্ট জিন্স পরা মেয়ে দেখে তাদের দীর্ঘশ্বাসের শেষ নাই। তাদের দীর্ঘশ্বাসে বাস ফেটে যায় অবস্থা।
বাসের জানালা দিয়ে দেখলাম, একদল পুলিশ সামনের দিকে ছুটে গেল। দাঙ্গা পুলিশ। হেলমেট, ঢাল ও লাঠি নিয়ে মারামারির জন্য পুরো প্রস্তুত। কিছুক্ষণ পর শুনলাম কাঁদানো গ্যাস ছোড়ার শব্দ। এই শব্দেই লোকজন ভয় পেয়ে হুড়মুড় করে বাস থেকে নেমে গেল। আমিও তাদের সঙ্গে নেমে গিয়ে একটা ছাপড়া দোকানের পাশে আড়াল করে দাঁড়ালাম।
সামনে কী ঘটছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবে লোকমুখে সংবাদ আসছে। সামনে ট্রাক ড্রাইভাররা রাস্তা অবরোধ করে রেখেছিল। পুলিশ তাদের পিটিয়ে ট্রাক সরিয়ে দিচ্ছে।
অল্প কিছুক্ষণ পরই বাস ছেড়ে দিল। আমরা আবারও হুড়মুড় করে বাসে উঠলাম। বাসে উঠে একটা সিটে কোন রকমে বসে পড়লাম। এবার পাশে বসল একটা ইয়াং ছোকড়া । এই ছোকড়া তো ঝামেলা করবে। সমস্যা নেই, বুক বরাবর হাত চালালেই গাল বরাবর রাম চড়।
আমি মোবাইল বের করে সময় দেখলাম। পৌনে পাঁচটা। আর গিয়ে কী হবে ? এতক্ষণে বোধহয় রিহার্সেল শেষ হয়ে গেছে। আমার আর টিভি নাটকে চান্স পাওয়া হল না। রিমা আপা মাইন্ড করবে। আমি কি মাংকি ক্যাপকে একটা ফোন দেব ? কিন্তু উনার নাম্বার যে আমার কাছে নেই। রিমা আপার থেকে চাওয়া যায়, না থাক।
বাস ছুটে চলেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে মাংকি ক্যাপের অফিসের সামনে পৌঁছে গেলাম।
তার অফিস তিন তলায় । সিঁড়িতে এসে ওপরের শার্টটা খুলে ফেললাম। গামছা ও শার্টটা ভাজ করে ব্যাগে ভরে নিলাম। ব্যাগে একটা লেডিস পারফিউম ছিল। ভালো করে স্প্রে করে নিলাম। গলার কাছটায় ডাবল স্প্রে মারলাম। ফুর ফুর করে সুগন্ধ বেরুচ্ছে।
আমার পরনে টাইট টি শার্ট আর জিন্স। ভি গলার টি শার্ট লেপ্টে আছে গায়ের সঙ্গে। ৩৪-২৬-৩৬ ফিগার এবার বোঝা যাচ্ছে। গলার কাছটা কি আরেকটু টেনে নামিয়ে দেব ? না থাক, ভেতরে হয় তো অনেক লোক থাকতে পারে। অনর্থক পাবলিককে গরম করে লাভ নেই। ব্যাগ থেকে একটা বড় লকেটের মালা বের করে গলায় ঝুলিয়ে নিলাম। খেয়াল করলাম, বেশ মানিয়েছে লকেটটা। এবার মাংকি ক্যাপ ডিরেক্টর কাত হবেই।
ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। দরজার সামনে লাগানো নেমপ্লেট - সিরাজ সব্যসাচী, পরিচালক, সিনেমা ও টিভি । রিহার্সেল কি শেষ হয়ে গেছে ? সবাই কি চলে গেছে ? আমি দ্বিধা নিয়ে কলিং বেল টিপলাম। দরজা খুলে দিলেন মাংকি ক্যাপ ডিরেক্টর সিরাজ স্বয়ং।
খেয়াল করলাম, লোকটা অনেক লম্বা। তার দৃষ্টিতে বুঝতে পারলাম, তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন।
‘আসুন’, বলে তিনি দরজা থেকে সরে গেলেন। আমি ভেতরে ঢুকলাম।
প্রথমে রিসেপসনের মতো ছোট একটা রুম। রুমটা আলো আঁধারি। তার পাশের রুমে তিনি গেলেন। আমিও তার পেছনে পেছনে ওই রুমে গিয়ে ঢুকলাম।
পেছন থেকে খেয়াল করলাম, তার হিপ মরা। আমার মা বলে, হিপ মরা পুরুষ নাকি খুব বদমাশ হয়। তার উপর এই লোক ফিল্ম ডিরেক্টর। আলুর দোষ না থেকেই পারে না। আর আমি তো আলুর দোষওয়ালা একটা ডিরেক্টরই খুঁজছি।
একটা মাঝারি মানের রুম। রুমের মাঝখানে একটা ডেস্ক। তার বিপরীতে একটা রিভলভিং চেয়ার। আর টেবিলের এপাশে দুটা চেয়ার। পাশের দেয়ালে একটা বুক শেলফ ভর্তি বই। টেবিলের একপাশে ছড়ানো অনেকগুলো ডিভিডি বক্স। এক কোণায় একটি টিভি ট্রলির উপর টিভি ও ডিভিডি প্লেয়ার।
তিনি গিয়ে রিভলভিং চেয়ারে বসলেন। তার সমানে একটা ল্যাপটপ খোলা। তিনি লেখায় মনোযোগ দিলেন। সামান্য লিখে তারপর আমার দিকে তাকালেন। তার মাথায় মাংকি ক্যাপ নেই। ভালোই তো লাগছে।
আমি হাসলাম। তিনি বললেন, আপনি কেমন আছেন ?’
‘ভালো। আপনি ?’
‘আমি ভালো আছি। তবে খুব ব্যস্ত। একটা স্ক্রিপ্ট নিয়ে ছেড়াবেড়া অবস্থা। ’
‘ও’ বলে আমি চুপ করে গেলাম। আর কথা খুঁজে পেলাম না। উনাকে কি জিজ্ঞেস করব, রিহার্সেল কি শেষ হয়ে গেছে কিনা। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলাম না।
আমি রুমের দেয়ালে সাটা তার একটা বিশাল ছবির দিকে তাকিয়ে রইলাম। চমৎকার একটা ছবি। একটা মনিটরের সামনে ডিরেক্টর সিরাজ। আলো ছায়ায় লোকটাকে দারুণ দেখাচ্ছে। বাস্তবে আবুল মার্কা চেহারা হলেও ছবিতে চৌকশ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা । ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ও চশমায় দারুণ মানিয়েছে লোকটাকে। বোধ হয় কঠিন মেক আপ করে এই ছবিটা তুলেছে।
তিনি উসখুশ করতে লাগলেন। বললেন, ‘আপনার কি আসার কথা ছিল আজ ?’
আমি বলার সুযোগ পেলাম। বললাম, ‘আজ নাকি রিহার্সেল ?’
‘রিহার্সেল !’, তিনি অবাক হয়ে গেলেন, ‘আজকে আবার কিসের রিহার্সেল ?’
আমি বোকা হয়ে গেলাম। বললাম, ‘রিমা আপা তো তা-ই বলল।’
‘ও, হ্যা, আজ তো রিহার্সেল ছিল। কিন্তু ওটা তো ক্যানসেল হয়ে গেছে।’
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। উনি ল্যাপটপে লিখে যাচ্ছেন। বসে থাকব না চলে যাব ভাবছি। সবচেয়ে বিরক্ত লাগছে লোকটা আমার দিকে ভালো মতো তাকাচ্ছেও না। তাহলে আমি টাইট জিন্স আর টি শার্ট পরে এলাম কেন ?
ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি অভিনয় কেমন জানেন ?’
‘পাঁচ বছর ধরে রিমা আপার দলে আছি।’
‘তাহলে তো অভিনয়ে ভালো হওয়ার কথা।’
আমি মিষ্টি করে হাসলাম। তবে এবার হাসার সময় গা দুলিয়ে দিলাম। দেখি, ব্যাটাকে ফাঁদে ফেলা যায় কি না। উনি চোখ তুলে তাকালেন না পর্যন্ত। শালা তো হেভি খাটাস। বুঝলাম, লোকটা অহংকারী। বড় ডিরেক্টর তো, এই জন্য বোধ হয় কাউকে পাত্তা দেয় না।
উনি খানিকটা লিখলেন। ঝিম মেরে তাকিয়ে রইলেন ল্যাপটপের মনিটরের দিকে। হঠাৎ বললেন, ‘আপনাকে চা খাওয়াতে খাওয়াতে পারছি না। আমার পিয়নটা আজকে আসেনি। আমার এসিস্ট্যান্টগুলোকেও আজ ছুটি দিয়েছি। আমি আবার একা না হলে লেখালেখিতে মনোযোগ দিতে পারি না।’
আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, ‘তাহলে আজ আমি উঠি।’
‘না, না, আপনাকে উঠার জন্য বলছি না। আপনি বসুন। আপনার সঙ্গে তো কথাই শেষ হয়নি।’
আমি মনে মনে হাসলাম। ভি গলার টি শার্টের প্রতিক্রিয়া বোধ হয় শুরু হয়ে গেছে। ভেতরে উনি একা আছেন জানলে ভি গলাটা টেনে আরও নিচে নামিয়ে দিতাম। এখন করব কি ? থাক, উনি টের পেয়ে যাবেন।

চলবে.......

পর্ব -০১। পর্ব -০২পর্ব -০৩পর্ব -০৫ । 

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 728

মন্তব্য

সাহাদাত উদরাজী-র ছবি

ওয়াও...।। চমৎকার বর্ননা। শেয়ার মার্কেট নিয়ে এমন না ভাবলেও চলত। হা হা হা...

হ্যা, কেমন আছেন ?’
‘ভালো না। ব্যবসাপাতি খারাপ । শেয়ার ব্যবসার কথা তো জানই। বিরাট ধরা খাইছি।’
আমি মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম। উচিত শিক্ষা হয়েছে। না জেনে শেয়ার ব্যবসা করতে যায় কেন ? এত লোভ ভালো না।

চলুক। জমে উঠছে খেলা আইমিন লেখা!

শাহজাহান শামীম-র ছবি

এটা তো একটা চরিত্রের ভাবনা। সে তো এ রকম ভাবতেই পারে। 

পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

সাহাদাত উদরাজী-র ছবি

বেশি দেরী করাবেন না প্লিজ।

 

আজাদ-র ছবি

নাটকের জগত্‌ তাহলে এইরকম হয়....!!!

দারুন উপভোগ্য হয়ে উঠেছে, চলুক....

শাহজাহান শামীম-র ছবি

এটা একটা গল্প , নাটকের জগতের ইতিহাস নয়। 

পড়ার জন্য ধন্যবাদ। 

মন্তব্য