চট্টগ্রামের নন্দীর হাটে মন্দিরে হামলা এবং সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিষয়ে মূলধারার মিডিয়াগুলো নির্লজ্জভাবে নীরব। কেউ কেউ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফায়দা লোটার চেষ্টাও করছেন। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে চলছে নানা ধরনের প্রচারণা। যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার শেষার্ধে এসে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী চক্র যে কোনো উপায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সংখ্যালঘু নিপীড়নকে ‘হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা’ এমনকি কোথাও কোথাও এককাঠি বেড়ে ‘হিন্দুদের আগ্রাসন’ বলে প্রচারের চেষ্টা চলছে। তাদের প্রচারণাগুলো একটু খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যায়, এগুলো প্রধানত মিথ্যা এবং সাজানো। দুঃখের বিষয় হলো- মূলধারার মিডিয়া এইসব সাজানো প্রচারণার ‘ভয়ে’ই নীরবতার পথ বেছে নিয়েছে।
মিথ্যার বেশাতি : মসজিদের দেয়াল ভেঙ্গে হিন্দুরাই আক্রমণ সূচনা করে
ঘটনার প্রচারণায় প্রধান মিথ্যাচার এটি। ফেসবুকে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী একটি ছবি শেয়ার করেছে, ছবিতে দেখা যায় (ছবি-১), দেয়ালে কিছুটা ভাঙ্গা একটি ভবনের সামনে একজন টুপী পড়া লোক এবং একজন মফস্বল পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ছবির নিচে লেখা- “মসজিদের সামনে ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে নিষেধ করায় উগ্রপন্থী হিন্দুরা হাটহাজারীর নন্দীরহাটে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি শুক্রবার দিনদুপুরে এভাবে ভেঙ্গে ফেলেছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশ যে ভারতের অঙ্গরাজ্য হতে চলেছে তা হিন্দুদের দুঃসাহস থেকে বোঝা যায়”।

ছবি-১
ছবি যুক্ত করে আসলে ভুলই করে ফেলেছে এই মৌলবাদী চক্রটি। কয়েকদিন আগে ঝাড়খণ্ডের এক মাওবাদীর ছবিকে সীমান্তে নির্যাতিত বাংলাদেশীর ছবি বলে চালাতে গিয়ে ধরা খেয়েছে এই দল। এবারেও সেই একই কূটকৌশল নিতে চেয়েছে তারা। মনেই রাখেনি, অনলাইন মিডিয়াতে এরই মধ্যে ওই মসজিদের ছবি এবং ভিডিওচিত্র আপলোড করা হয়ে গেছে। সেসব ছবিতে মসজিদের যে ছবি (ছবি-২) দেখা যাচ্ছে তার সাথে এই ছবির কোনো মিলই নেই। দ্বিতীয়োক্ত এই ছবিটিই দেখা যাচ্ছে সবগুলো মাধ্যমে। মসজিদের জানালাটি যে আগে থেকেই ভাঙ্গা, তার প্রমাণ ইটের ঠেকনা দিয়ে জানালার অপর অংশগুলো রক্ষার চেষ্টা এবং তা করা হয়েছে ভেতর বাহির দুই দিক থেকেই। তা ছাড়া প্রথম ছবিটি একটু খেয়াল করলেই দেখবেন ছবিতে ভাঙ্গা অংশে রয়েছে মাকড়সার জাল এবং পোকার বাসা, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেটি সম্ভব নয়। (একজন প্রত্নতাত্ত্বিক এবং স্থাপত্য সংরক্ষণে অভিজ্ঞতা থাকায় এটি আমার কাছে বেশ পুরনো ভাঙ্গা বলেই মনে হচ্ছে)।

ছবি-২
এই অপশক্তি শুধু যে ভুল ছবিই আপলোড করেছে তা নয়, বর্ণনাতেও করেছে বিস্তর ভুল। প্রথমোক্ত ছবির বর্ণনামতে মসজিদে হামলার সময় “শুক্রবার দিনেদুপুরে”। অথচ খবরে প্রকাশ মসজিদে ঢিল ছোড়া (?) হয় বৃহস্পতিবার। এরই প্রতিবাদে (?) বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার দু’দিন ধরে চলে সংখ্যালঘু নিপীড়ন।
ঘটনার সূত্রপাত, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দুপুরের বিবরণ নিয়েও আছে কিছু বিভ্রান্তি। নয়া দিগন্ত এবং ইরান বাংলা রেডিও-র ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার যখন লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উৎসব হচ্ছিলো তখন জোহরের আজান হচ্ছিলো, আজানের সময় ঢোল বাজানো বন্ধ করার অনুরোধ করতে ৩ যুবক এগিয়ে আসলে তাদের সাথে লোকনাথ ভক্তদের কথাকাটাকাটি এবং এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়। অন্যদিকে বাংলাবাজার পত্রিকা এবং কয়েকটি নিউজ ওয়েবসাইটের বর্ণনা মতে সে সময় নামাজ চলছিলো, স্থানীয় কতিপয় ধর্মপ্রাণ মুসলিম যুবক নামাজের সময় (নামাজ না পড়ে?) ঢোল বন্ধ রাখতে অনুরোধ করতে এগিয়ে আসলে তাদের সাথে লোকনাথ ভক্তদের কথাকাটাকাটি এবং এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়। অন্য কয়েকটি নিউজ ওয়েবসাইট এবং বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম জানাচ্ছে, কথাকাটাকাটি ও সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে বৃহস্পতিবার সকালে। একই কথা জানাচ্ছে জনকণ্ঠও, তারা এও জানাচ্ছে, “মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধুলোবালি উড়া”কে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়।
মনে রাখা দরকার বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রামে হরতাল ডেকেছিল যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। এবং যে মাদ্রাসা থেকে মন্দির ভাঙ্চুর এবং সংখ্যালঘু নিপীড়নের নেতৃত্ব দেয়া হয়, সেটি ছাত্রশিবিরের ঘাঁটি বলে পরিচিত।
মসজিদের দেয়াল ভাঙ্গার কোনো ঘটনাই যে ঘটেনি, সেটি আমরা পূর্বোক্ত ছবিগুলো থেকে জেনে গেছি। সময় সংক্রান্ত বিবাদ ইত্যাদি থেকে এটিও বুঝে গেছি- আজান, নামাজ বা মসজিদের সাথে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। দ্বন্দ্ব হরতালের সাথে। হরতাল চলছে অথচ লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ভক্তরা উৎসব করবে এটি মেনে নিতে পারেনি মৌলবাদী চক্র। উৎসবের শোভাযাত্রায় বাধা দিয়েছে তারা, বাধায় দুপক্ষে হাতাহাতিও হয়ে থাকতে পারে, অস্বীকার করি না। কিন্তু আজান বা নামাজের সময় ঢোল বাজানো, মসজিদে হামলা, ভাঙ্চুর একেবারেই বানোয়াট।
সংযুক্তি:
লেখার ভেতরে যুক্ত লিংকগুলো ছাড়া আরো যেসব ওয়েবসাইটে নামাজ চলাকালে মসজিদে ঢিল ছোড়ার কথা বলা হয়েছে: ১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭
সকালে সংঘর্ষ/হাতাহাতির কথা যেসব ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে: ১
মসজিদের ছবিটি (ছবি-২) আরো যেসব সাইটে আছে: ১
"মসজিদ ভাঙ্গা দেশকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা" বিষয়ে আমিনীর বিবৃতি: ১ ২ ৩
মন্তব্য
জামাত শিবিরের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তথ্য ভিত্তিক রিপোর্ট দিয়ে সত্য উন্মোচনের জন্য ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ এই মিথ্যাচারকে সামনে নিয়ে আসার জন্য... এই ছাগুদের গদাম দিতে না পারলে বিপদ আছে...
লিঙ্কগুলা এড করে দিবেন নাকি? কোন ইস্যু না থাকলে ফেসবুক গ্রুপগুলা ও।
অ,ট একটা ইন্টার ব্লগ মেইল সার্ভিস থাকলে খারাপ হয় না।
লিংকগুলো দিয়ে দিলাম। ধন্যবাদ।
অফ টপিক: ব্লগের ইন্টারনাল মেইল সার্ভিসের কথা বলছেন? ছিল তো; যতোদূর মনে পড়ে ব্লগারদের আপত্তির মুখেই মনে হয় সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আমি যতোটুকু জানি, এটা চালু করা খুবই সামান্য ব্যাপার। একটা মডিউল অন করে দিলেইমেইল সার্ভিস চালু।
রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু, কেউ নেই শূন্যতা-
আকাশে তখন থমকে আছে মেঘ,
বেদনাবিধুর গীটারের অলসতা-
কিঞ্চিৎ সুখী পাখিদের সংবেদ!
প্রথম আলো তো বলিকা গ্রাম্যবঁধুর মতো ভাসুর আর মামা শ্বশুরের নাম মুখে নিতে পারল না। খবরটি চেপে যাওয়ার ঘটনাকে কেউ কেউ ‘জাতির বৃহত্তর স্বার্থে’ ’দায়িত্বশীলতা’ বলে প্রচার করছে। এমন বলছে কেউ কেউ যে ‘ভারতে দাঙ্গার আশংকায় ভারতীয় হাইকমিশন থেকে সরকারকে এ সংবাদ গোপন রাখতে অনুরোধ জানানো হয়’। যত্তোসব ফাইজলামী। নির্যাতনের তথ্য গোপনের একটাই উদ্দেশ্য থাকতে পারে - সেটা হচ্ছে নিপীড়কদের রক্ষা করা। এই সব ‘দায়িত্বশীল’ গণপ্রতারণামাধ্যমের মুখে পেচ্ছাব করার দিন এসেছে।
........................................................
আদিবাসী বাঙ্গালী যত প্রান্তজন
এসো মিলি, গড়ে তুলি সেতুবন্ধন
আমি ভাবছিলাম "টিনের তৈরী মসজিদ" এখন দেখি দালান! হিন্দুদের এত শক্তি যে দালান ভেঙ্গে ফেলে
Ajob desh!.......As a muslim I condemn the henious religious madness. There is no harm saying namaz while others are praying in there way as far my knowladge goesn.....funny thing is evry time any vandalism occurs some people tries to take cover uder religion.....
+
ইরান বাংলা রেডিওর তরফ থেকে প্রচারিত উস্কানিমূলক রিপোর্টিং, সেখানে তোড়জোড়ের সাথে চট্টগ্রাম মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবির (উত্তর) এর সভাপতি আর ইসলামি আইন বাস্তবায়ন কমিটির আমির মুফতি ফজলুল হক আমিনী'র বক্তব্য প্রচার।
এলাকার সাধারণ মানুষরা যে কোন অগ্নিসংযোগ/ভাংচুর/লুট করে নাই তা ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলার বক্তব্যে স্পষ্ট। নন্দীর হাটের ঘটনাকে some people'এর বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নাই, বিশেষত এই পোষ্টের বিশ্লেষণে তা যথেষ্ট স্পষ্ট।
নন্দীর হাট বা সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমন কোন নতুন ঘটনা নয়, আক্রমন কথিত মুসলমানরাই শুরু করে, তারপর এমন একটা ধর্মীয় যুক্তির ফাঁদ পাতে যাতে অপরাপর মুস্লিম এলাকাবাসী ও ধর্ম রক্ষার আন্দলনে শরিক হয়ে যায়।
শান্তি আসুক।
মন্তব্য