slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

মীরকাদিমের কুমারী গাভী

একটি খসড়া গল্প
 
আপনিও ভেবে দেখলেই দেখবেন যে, এটা স্রেফ নির্বিচারে পশু হত্যা দিবস। অনেক করেছি ভাই, বাপ-দাদা চৌদ্দ গোষ্ঠী ধরে নির্বিচারে একই কাজ করে আসছি। কিন্তু মনে হয়, আর করা ঠিক না, মানুষের তো অনেক বয়স হয়েছে! অনেক আগেই বন ছেড়েছে; এখন বন্যতা ছাড়ার সময় হয়েছে। প্রকাশ্যে এরকম নৃশংসতা- এরকম আরন্যক ভাবনা-চিন্তা আচার-আচরণ অন্তত আজকের মানুষের মানায় না। কী ভয়ংকর অবস্থা ভাই চিন্তা করেছেন, একটি প্রাণী আরেকটি প্রাণীকে একটি বিশেষ দিনে নির্মমভাবে হত্যা করছে আর বলছে এটা একটা ধর্মীয় উৎসব! গণপশুহত্যার নৃশংসতাকে বলা হচ্ছে ধর্ম! তা আবার সাড়ম্বরে উদযাপন করছে! আমি ভাই এসবে আর নেই; আমার বউকেও আমি বলে দিয়েছি, বউ, তুমি যা কওয়ার কও, তবে আমি কিন্তু আর ওসবে নেই। মাংসাষির ঘরে জন্ম নিয়েছি; জীবনে এ পর্যন্ত অনেক মাংস খেয়েছি। আর খেতে চাই না। বয়সও হয়েছে, ডাক্তারও বলেছে, চল্লিশের কোঠায় পা দিলে ওই বিশেষ মাংস না খাওয়াই ভালো। এছাড়া অধিকাংশ চিকিৎসকদের চোখেই মাংস ক্ষতিকর- সেটা অনেকেরই জন্য। গিয়ে দেখেন না, ঠিক ঠিক চিকিৎসক আপনাকেও মাংসের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেবে। যে জিনিস নিশ্চিন্তে সব সময় বা আজীবন খাওয়া যায় না, সেই ক্ষতিকর নিষিদ্ধ জিনিস খেয়ে আত্মহত্যা কেন করবো? আমি না হয় বউসহ করলাম, আমার পোলা-মাইয়াও একই কাজ কেন করবে? আমার কাছেই তো কুরবানি এখন দূর-বাণী মনে হয়। কুরবানি বিষয়টা কি? আমিও তো এক কথায় কইতে পারি না। আপনারে জিগাইলেও আপনি খুব বেশি কইতে পারবেন না। যে জিনিস নিয়ে দুয়েক-কথায় অর্থপূর্ণ বা গুরুত্ববহ কোনো কথা কেউ কইতে পারে না, কেউ জানেই না, সেই অর্থহীন আচার মানুষ কেন বছরের পর বছর অব্যাহত রাখবে? কে কী মনে করে জানি না, তবে আমি মনে করি- মানুষের জীবনে এমন মহাসংঘবদ্ধভাবে পশুহত্যার আর কোনো প্রয়োজন নেই। এমন ভয়ানক রক্তারক্তি আর ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে মানুষকে অলৌকিক কোনো সত্ত্বার প্রতি প্রীতি প্রদর্শন করার আর কোনো দরকার নেই। মানুষের চোখের সামনেই প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ কুরবানি হয়ে যাচ্ছে, মানুষ এমনই গরু, দেখতেই পায় না। সেই মহামূর্খ আত্মঘাতী প্রাণীকে অন্য নিরীহ প্রাণী হত্যার মাধ্যমে আত্মত্যাগ শেখানো আমার কাছে ইদানিং রীতিমতো হাস্যকর ব্যাপার মনে হচ্ছে।’ হয়তো তিনি একনাগাড়ে আরও অনেক কথাই বলতেন, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিলেন আরেকজন। যিনি থামিয়ে দিলেন তিনি কথা বলার আগেই আরেকজন মুখ খুললেন সক্ষোভে; বললেনঃ ‘আমার খুবই অবাক এবং মজা লাগে এটা ভেবে যে, একই কাজ করে কেউ হয় কসাই, কেউ হয় হুজুর! কসাইকে ঘৃণা-নিষ্ঠুরতা-কৃপণতাসহ নানা দোষের রসে কষিয়ে ভয়ংকর এক বিশেষণ করে তোলা হয়েছে, অথচ একই কাজ যখন কোনো মতবিশ্বাসের নামে দাড়ি-টুপি-পাজামা-পাঞ্জাবিওয়ালা কোনো মানুষ করছে, তখন তাকে পরমভক্তিতে হুজুর বলে তোয়াজ করা হচ্ছে! যে মানুষ এরকম নির্বিকারভাবে নির্বিচারে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে, সে যে-ই পোশাকে যেখানেই থাকুক না কেন, সে তো সাধারণ স্বাভাবিক মানুষ নয়, সে নিঃসন্দেহে ভয়ংকর মানুষ। খুনি মানুষ। যিনি এরকম খুনাখুনি করতে পারেন, তিনি কীভাবে ধার্মিক বা সত্যিকারের মানুষ হতে পারেন? এই সাদামাটা প্রশ্নটাই অনেকের মাথায় ঢুকে না। কিন্তু আমি এতে অনেক সহজেই মানুষের সংঘবদ্ধ কঠিন মূর্খামি আর অসারত্ব টের পাই।’ যিনি বলছিলেন, তিনিও বেশিদূর যেতে পারলেন না, এবার ভর্ৎসনার সুরে প্রথম এবং দ্বিতীয়জনকে উদ্দেশ করে বললেনঃ ‘এটা একেবারে ন্যাকামি হচ্ছে। বিদ্যা-বুদ্ধি বদ হজম হলে মানুষ মাঝে মাঝে এরকম ঢেঁকুর তোলে। দুই দিনের বৈরাগী, ভাতেরে কয় অন্ন। এসব আঁতলামিই আসলে জঘন্য। মিয়া, গাঁটের পয়সা বাঁচাতে চান তো বাঁচান; আপনাকে মানা করেছে কে? কিন্তু বিশ্বাসী মানুষকে উৎসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? মানুষ তো মাংস খাবেই। আপনিও তো মাংস পেলে সব ভুলে যান। নিশ্চয়ই এবারও আপনার বাসায় যদি কেউ মাংস নিয়ে আসে আপনি ফিরিয়ে দিলেও আপনার বউ রেখে দিবে। আর সেই মাংস রান্না হয়ে টেবিলে এলে আপনি যে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেয়ার দুঃসাহস দেখাবেন তা তো এখনো মনে হয় না। আপনি যদি মাংসই খান, তবে সেটা কবে কখন কারা সংঘবদ্ধ না অসংঘবদ্ধভাবে করলো এসবে কী এসে যায়? ধরি ছেড়েই দিলেন, আপনি একজন নয়া বুদ্ধ হলেন, কিন্তু এতদিন যে খেলেন, তার কী হবে?’
এবার প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ ঝরিয়ে প্রথমজন বললেন, আমার মাংস খাওয়া না-খাওয়ায় কোনো চেট-ও আসে যায় না। কিন্তু এরকম মুখ বুঝে থাকাটাও কোনো কাজের কথা নয়। আমি খেয়েছি খাচ্ছি সে তো আমাকে এরকম মাংসাষি বানানো হয়েছে বলে। জন্মের পর থেকে লক্ষ কোটি খাদকের সঙ্গে বসবাস করছি। আমার খাদ্যাভাস তো একা আমার নয়। আমাকে যা খাইয়ে অভ্যস্ত করা হয়েছে আমি তাই খাচ্ছি। আমাকে যদি মাংস খেতে না দেয়া হতো, আমি খেতাম না। প্রকৃতিতে পৃথিবীতে নিশ্চয়ই আরও অনেক খাবার আছে, যা খেয়ে মানুষ দিব্যি দীর্ঘ জীবন যাপন করতে পারে এবং করেছেও। আমি খেয়েছি বলে খেয়েই যাবো, বোকা ছিলাম বলে বোকাই থাকবো, এটা হতে পারে না। আমি আজ এ আওয়াজ তুললাম, যাদের কান আছে, মন আছে তারা শুনবে, বুঝবে এবং একদিন ধীরে ধীরে ওই বদ অভ্যাস ছেড়ে মানুষের মতো মানুষ হবে। সেটা পাঁচ ’শ ছ ’শ যত সহস্র বছরই লাগুক না কেন!
এমন সময় একজন, যিনি পশুহত্যাবিরোধী কট্টর ব্যক্তিটির অন্তরঙ্গ বন্ধু বলে সমবেতদের কাছে পরিচিত, তিনি স্বগতোক্তির মতো করে বলতে লাগলেনঃ ‘আমি ইনশাল্লাহ, আগামী বছর একটা মীরকাদিমের গরু কুরবানি দিবো!’ মীরকাদামির গরু! ব্যাপারটি অনেকেরই কানে নতুন ঠেকলো। অনেকেই কান টান টান করলেন। গল্পকার জানালেন, মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম এলাকায় বিশেষ যত্নসহকারে গরু লালন-পালন করা হয়। বিশেষ প্রজাতির গরু। দেশের বিশেষ প্রজাতির মানুষের জন্য। বিশেষ প্রজাতির মানুষ মানে,  যাদের গাঁটে অনেক অনেক টাকা থাকে। যারা আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি জাহিরের জন্য প্রতিবছর একসঙ্গে বেশ কয়েকটি গরু কুরবানি দেয়ার সামর্থ রাখেন। বিশেষ করে ঢাকাইয়া কুট্টিরা মীরকাদিমের গরু কুরবানি দেয়াকে তাদের সামাজিক প্রতিপত্তি মান-মর্যাদার পরিমাপক অনুষঙ্গ মনে করেন। ব্যাপারটা অনেকটা এরকমও যে, একজন দশ-বারোটা গরু কুরবানি দিচ্ছেন, এরমধ্যে যদি একটি মীরকাদিমের গরুও থাকে, তাহলেই তার খানদান বংশ-গৌরব রক্ষা পেলো! মীরকাদিমের  গরুর রঙেও বিশেষত্ব আছে। তার গায়ের রঙ হয় দুধসাদা। ধবধবে সাদা। নিখঁুত সাদা। তাকে উৎকৃষ্ট মানের ঘাস বা পোলাও-কোর্মার মতো ভালো ভালো খাবার খাওয়ানো হয়। ভালো খাবার খেয়ে গরুটি গায়ে গতরে লম্বায়-দীঘে-প্রস্থে ফুলে-ফেঁপে নাদুস-নুদুস আকারের হয়। চোখ হয় চমৎকার লাল। মায়াবীও বলতে পারেন। আরও সহজ করে বললে, যদিও ফরাশগঞ্জ নামের একটি নির্দিষ্ট বাজার ছাড়া ওই গরু পাওয়া যায় না, তবুও যে কোনো বাজারে ওই গরু উঠালে দূর থেকে দেখেই মীরকাদিমের গরু চিনতে পারবেন। গল্পের এ পর্যায়ে আরেকজন কত্থককে শুধরিয়ে দিয়ে বললেন, মীরকাদিমের গরু নয়, মীরকাদিমের গাভী, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে বলা উচিত- মীরকাদিমের কুমারি গাভী। এ কথায় সমবেত প্রায় সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। তাদের নিজ নিজ প্রজাতির অক্ষতযোনী কুমারীর প্রতি যৌনতাগন্ধী আগ্রহ থাকার কারণে তারা সবাই প্রায় সমানভাবে পুলকিত হলেন। কত্থক এতে দারুণ মজা পেয়ে, আরও সুবিস্তারিত বিবরণে মত্ত হলেন, বললেন, মীরকাদিমের গাভীগুলোকে শাহী খাবার-দাবার খাইয়ে পোষা হয়, এ কারণে তাদের মাংসও হয় তুলনামূলক নরম তুলতুলে- কিন্তু তাদেরকে প্রজননের কাজে ব্যবহার করা হয় না। মানে তাদের কোনোপ্রকার যৌন অভিজ্ঞতার সুযোগই দেয়া হয় না। পরিকল্পিত ও পরিমিত খাবার গ্রহণের ফলে কুমারী গাভীটি যে দেহ-সৌষ্ঠব রূপ-যৌবনের অধিকারী হয়, তা আসলে মানুষের রসনা-বিলাসের জন্যই। 
এবার মীরকাদিমের গাভী কুরবানি দেয়ার ইচ্ছাপ্রকাশকারী আবার শুরু করলেন, বললেন, আমি তো আর বাজার থেকে এতো এতো টাকা দিয়ে মীরকাদিম কিনতে পারবো না, আমি এবছর, কুরবানির পর পরই একটি মীরকাদিমের বাছুর কিনবো। সেই বাছুর বছরজুড়ে লালন-পালন করবো। আমিও তাকে রাজকন্যা আদরে রাখবো। রাতে মশারি টানিয়ে দিবো। পাকা মেঝের ঘরে রাখবো। মীরকাদিমের লোকজন যা খাওয়ায় আমি তা তো খাওয়াবোই, পারলে পশুপুষ্টিবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে আরো পুষ্টিকর খাবার খাওয়াবো। এবং আগামী কুরবানিতে তাকে কুরবানি দিবো। কুরবানিতে আপনারা, আমার বন্ধুজন, শুভার্থী-সুহৃদ যারা আছেন, তাদের সবাইকে দাওয়াত করবো। করবো কী, ধরেন এখনই করে ফেললাম, আগামী বছর আপনারা ওই কুমারী গাভীর কুরবানিদৃশ্য দেখবেন। চোখের সামনেই দেখতে পাবেন কেমন করে আস্ত একটি সুন্দরী কুমারী গাভীর গলায় ছুরি চালানো হয়, ধীরে ধীরে চামড়া ছাড়ানো হয়, শরীর ব্যবচ্ছেদ করে টুকরো টুকরো করা হয়; দেখতে পারবেন কেমন করে তা সুস্বাদু সুগন্ধী খাবারে পরিণত হয়। আমি সবাইকে মীরকাদিমের কুমারী গাভীর মাংস খাওয়ার উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
এখানে যেরকম লেখা হলো, মীরকাদিমের গাভীর কুরবানি বা মাংস হওয়া বা খাওয়ার গল্প নিঃসন্দেহে আরও লোভনীয় হয়ে উঠেছিল গল্পকারের কথনগুণে। আর তা বোঝা গেলো প্রথম দিকে পশুহত্যাবিরোধী  বক্তাটিরও উৎসাহী হয়ে ওঠার কারণে। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই ভালো হবে। এমন যত্ন করে লালন-পালন করে কুরবানি দিলে ব্যাপারটা এবং মাংসটা নিশ্চয়ই ইন্টারেস্টিং হবে। আমিও যাবো, এবং খাবো! দিনকাল যা পড়েছে, কুমারী মেয়ের মাংসের চেয়ে নিশ্চয়ই কুমারী গাভীর মাংস অনেক নিরাপদ; উপভোগ্য হবে।’ বলেই বিশ্রিরকমভাবে হাসতে লাগলেন। বক্তব্যটি ঠিক ভদ্রজনোচিত না হলেও সমবেত ভদ্রজনেরা এতে অনেক মজা পেলেন। আবারও সমবেত হাসিতে কাশিতে ফেটে পড়লেন।
কিন্তু কথাটা কানে লাগলো, এতক্ষণ ধরে একটি কথাও না-বলা একজনের। বোঝা গেলো, সবাই যখন হাসছিলেন তিনি তখন মোটামুটি বিরক্ত হচ্ছিলেন। সেই বিরক্তির ঝাঁঝ কণ্ঠে প্রকট করে তিনি বললেনঃ তাহলে মানে দাঁড়ালো কি? মীরকাদিমের কুমারী গাভী কুরবানিতে আপনার কোনো সমস্যা নেই। তাহলে কী, কুরবানি আপনার সমস্যা নয়, সমস্যা কুরবানির পশুটির শরীর? অথচ, এটা তো আরও ভয়ংকর। আরও নৃশংস!
 
লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 476

মন্তব্য

কাদের সিদ্দিকীও মানসো খায় না। হেহেহেহে।

এইরাম একটা দুর্ধর্ষ গল্ফ মারার পর গুস্ত খাওয়ার কথা ভুইলা যাওয়ার কতা মাইনষ্যের। যদিও বিনয়ই সঠিক, সকল ফুলের কাছে মোহময় মনে গেলেও মানুষ কিন্তু মাংসরন্ধনকালীন ঘিরান সবচাইয়া বেশি ভালোবাসে।

মানুষ যা পায় তাই খায়।

 

 

হ। মনিষ্যি একটা সর্বভুকিং প্রিরানি।

 দুরন্তদা, খসড়াটাই উন্মোচন করলাম! কিন্তু উন্মোচনে তো পাঠকের বড় অভাব! বা মনোযোগী পাঠকের! বা সব খানেই! অনলাইনে কেনো যেনো ফানলাইনই ভালো জমে, এ কারণে আমাদেরকে আসলে কাগুজে ভাবনাও মাথায় রাখতে হবে! কাগুজে লেখা মগজে যেরকম কাজ করে, অনলাইন বোধহয় এখনো তেমন করছে না!

আমি জানি, অনেকেরই মুখে আধফোটা ভাষা; উন্মুখ অধীর অপেক্ষায় তারা, কেবল পতনের প্রত্যাশা...

মন্তব্য